বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: ছয় বছর ধরে একটি অ্যাসফল্ট মিক্সিং প্ল্যান্টের ধোঁয়ার তাপে নাজেহাল রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামের মানুষ। প্ল্যান্টের ধোঁয়ায় মাঠের ফসল পুড়ে যাচ্ছে, পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে, আর মানুষের শ্বাস নেওয়াই হয়ে পড়েছে কষ্টকর। বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন শ্বাসকষ্টজনিত রোগে। একাধিকবার উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।
জানা গেছে, ছয় বছর আগে সাধুর মোড়-কাঁকনহাট সড়কের সংস্কারকাজের সময় বাগেরহাটের এক ব্যক্তি পাহাড়পুর গ্রামের রাস্তার পাশে বসান অ্যাসফল্ট মিক্সিং প্ল্যান্টটি। রাস্তার কাজ অনেক আগেই শেষ হলেও প্ল্যান্টটি আর সরানো হয়নি। এখন আশপাশের সব সড়কের বিটুমিন, পাথর ও ডাস্টের মিশ্রণ তৈরি হচ্ছে এখানেই। চিমনির উচ্চতা কম হওয়ায় আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে কালো ধোঁয়া।
মঙ্গলবার ২৪ জুন সকালে গিয়ে দেখা যায়, প্ল্যান্টটি সচল অবস্থায় রয়েছে। এর চিমনি থেকে ঘন ধোঁয়া উড়ছে আশপাশে। এই প্রতিবেদক সেখানে অবস্থান করার কিছুক্ষণ পরই প্ল্যান্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক কর্মচারী পরিচয় দিয়ে শামসুর রহমান সুজন বলেন, আশপাশের যেসব প্রকল্পে রাস্তার কাজ হয়, সবগুলোর বিটুমিন ও পাথরের মিশ্রণ এই প্ল্যান্ট থেকেই নেওয়া হয়। তবে চিমনির উচ্চতা নিয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি।
প্ল্যান্টের শ্রমিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘পাশের পুকুরের মালিক কিছুদিন আগে অভিযোগ দিয়েছিলেন যে মাছ মারা যাচ্ছে। তারপর আমরা চিমনির পাইপ ১০ ফুট উঁচু করেছি।’
কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। গ্রামের একটি পুকুরে গিয়ে দেখা যায়, পানির ওপরে তেলের মতো কালি ভাসছে। সেই কালো আবরণ তুলে দেখালেন পাহারাদার আব্দুল হাসিম। তাঁর ভাষায়, ‘এসব কালি চিমনি থেকে উড়ে এসে পড়ে। এতে তিন মাস আগে আমাদের পাঁচ লাখ টাকার মাছ মারা গেছে। ইউএনওর কাছে গেছিলাম, কিন্তু এখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসন যেন ব্যবস্থা নেয়। না হলে মইরে যাব আমরা।’
মাছচাষী মেসবাউল হক বলেন, ‘আমার পুকুরে অক্সিজেন কমে গেছে ধোঁয়ার কারণে। চার লাখ টাকার মাছ মরে গেছে। এখনো পানির ওপরে এক আঙ্গুল কালি জমে আছে। ধোঁয়ার গন্ধে ভাত খাওয়া যায় না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই গন্ধ সহ্য করতে হয়।’
কৃষক এনামুল হক বলেন, ‘পটলের ফুল ঝরে গেছে, আম পড়ে গেছে। গাছপালা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম এলাকার রাস্তায় কাজ হবে, তাই মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখন তো সব রাস্তার কাজ এখান থেকে হচ্ছে। ছয় বছর ধরে এমন কষ্টে আছি আমরা।’
পাহাড়পুর এলাকায় বাগান আছে কামারপাড়া গ্রামের নাসির উদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘আম ঝরে পড়ছে। পচে যাচ্ছে। ক্ষতির পরিমাণ দুই-তিন লাখ টাকা। প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে কৃষক টিকে থাকবে না।’
মাতোয়ারা বেগম নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই কালো ধোঁয়া আমাদের শরীরে ঢুকছে। শ্বাস নিতে পারছি না। আমার এখন শ্বাসকষ্ট। গ্রামের অনেকেই একই সমস্যায় আক্রান্ত।’
আরেক বাসিন্দা ইসরাফিল হক বলেন, ‘এলাকার পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। কাজ হোক, কিন্তু পরিবেশটা তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’
প্ল্যান্টের মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে অপারেটর আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘সব প্ল্যান্টেরই চিমনি এমনই হয়। আমরা অভিযোগ পাওয়ার পর পাইপ একটু উঁচু করেছি। এরপর আর কেউ কিছু বলেনি।’
বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির গোদাগাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী মুনছুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘স্থানীয়দের কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের সহকারী পরিচালক কবির হোসেন বলেন, ‘যদি কেউ লিখিত অভিযোগ দেন, বা হোয়াটসঅ্যাপে ছবিসহ তথ্য পাঠান, তাহলে আমরা গিয়ে দেখব। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’