বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
নুরুজ্জামান,বাঘা :
চড়ক পূজা চৈত্র সংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিবসে পালিত হয়। এ পূজার বিশেষ অঙ্গের নাম নীলপূজা। পূজার আগের দিন চড়ক গাছটিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। এতে জলভরা একটি পাত্রে শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ বা সিঁদুরমথিত লম্বা কাঠের তক্তা (‘শিবের পাটা’) রাখা হয়, যা পূজারিদের কাছে “বুড়োশিব” নামে পরিচিত। এ পূজা প্রতিবারের ন্যায় এবারও পালিত হয়েছে। রাজশাহীর বাঘায় নিজের শরীরে লোহার বড়শি ফুটিয়ে খোলা মাঠে ‘চড়ক’ গাছে ঘুরপাক খেয়ে নেচে-গেয়ে পালন করা হয়েছে ‘চড়ক উৎসব’।
সোমবার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার আড়পাড়া শ্রীরামপাড়া মাঠে এ উৎসব পালন করা হয়। শিব পূজাকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নিজেদের শরীরে লোহার বড়শি ফুটিয়ে এ উৎসব পালন করেন। এ সময় পুলিশের সামনেই প্রকাশ্যে নেশাজাতীয় মাদকদ্রব্য সেবন করে তারা। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন থানার ওসি (তদন্ত)। নৃগোষ্ঠীদের ভাষ্য আজকের দিনে তারা ধর্মীয় উৎসব পালন করতে মাদক সেবন করে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পূজার ঘরে খালি গায়ে মূল সন্ন্যাসিকে মাটিতে শোয়ানোর পর ৪ জন মানুষ দুই হাত দুই পা চেপে ধরে আঙ্গুলের মতো মোটা লম্বা দুটি লোহার বড়শি মেরুদণ্ডের দুই পাশে ফুটিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত। এরপর বড়শিতে নতুন একটি গামছা বেঁধে সন্ন্যাসীকে শূন্যে তুলে ধরে চড়ক গাছের ৩০ ফুট ওপরে ঝুলিয়ে একে একে সাত পাক ঘুরানো হয়। এরপর অন্য সঙ্গীরা মাটিতে নামিয়ে বড়শি খুলে দেয়।এভাবেই হাতে দড়ি নিয়ে বড়শিবিদ্ধ শরীর নিয়ে ‘চড়ক’ গাছে ঘুরপাক খায় মূল সন্ন্যাসী। এর একদিকে থাকে বড়শিবিদ্ধ একজন মানুষ। সোমবার পহেলা বৈশাখ বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এভাবেই ঘুরানো হয় ৪ জনকে।
আয়োজকরা বলেন, শিব ভক্ত বান রাজা তার সঙ্গীদের নিয়ে শিবকে পাওয়ার জন্য প্রার্থনায় মত্ত হয়ে নিজের শরীর থেকে রক্ত বের করে তা শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে। এতে শিব খুশি হয়। এ কারণে শিবকে খুশি করার জন্য শরীরের রক্ত ঝরিয়ে খোলা মাঠে ‘চড়ক’ উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে। নিজেদের মঙ্গল কামনায় বংশ পরম্পরায় আমরা এটি পালন করে আসছি। তারা বলেন, চড়ক ঘোরা কোনো কষ্টের বিষয় নয়। ভগবান আমাদের সঙ্গে থাকলে ব্যাথা লাগবে কেন? তবে বড়শি বিদ্ধের যন্ত্রনা মানুষ সহ্য করলেও অভিভাবকরা সন্তানের সে যন্ত্রনা ভোগ করেছেন।
এ ব্যাপারে আয়োজক কমিটির নেতা অরবৃন্দ ঠাকুর বলেন, আদিবাসীদের ধর্ম বিশ্বাসে ছেলেমেয়েদের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আদিবাসীরা শিব পূজার ধর্মীয় আচরণের মাধ্যমে চড়ক উৎসব পালন করে থাকেন। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসী সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহাতো, তাদের নিজ নিজ রীতিতে প্রতি বছর এ উৎসবে মেতে ওঠেন। যারা পূজায় অংশগ্রহণ করেন, তাদের আমিষ খাবার, হলুদ, তেল ও সব রকম মসলা জাতীয় খাদ্য পরিহার করতে হয়।
স্থানীয় সমাজ প্রধান রুপকুমার বলেন, শত শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে শিব পূজায় এমন আয়োজন হয়েছে। অনেকে মন বাসনা পূর্ণের জন্য মানত করেন। কথিত আছে , এখানে মানত করলে কঠিন রোগ থেকে মুক্তি মেলে। তাই অনেকেই এই দিনটির জন্যে অপেক্ষামান থাকেন। নেশাজাতীয় মাদক সেবন সম্পর্কে তিনি বলেন, আনন্দের জন্য আমাদের এখানে তালের রস পান করা হয়। এই আয়োজনে এসব পান করতে তেমন কোনো অনুমতি লাগে না।
এ ব্যাপারে বাঘা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল রানা বলেন, ধর্ম যার-যার ,উৎসব সবার। আমরা এই উৎসবকে সফল করতে প্রতি বছর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আর্থিক সহযোগিতা করে থাকি।
চড়ক পূজার মেলায় গিয়েছিলেন বাঘা থানা পুলিশের পরিদর্শক (ইন্সেপেক্টর তদন্ত) সুপ্রভাত মন্ডল। তিনি বলেন, মেলা ঘুরে দেখে আমি খুশি হয়েছি। এবার মেলার পরিবেশ খুবই সুন্দর ছিল। যে হেতু এটা তাদের ধর্মীয় উৎসব সে কারনে তারা নেশা বলতে তালের রস সেবন করেছে। এটা বড় কোন উস্যু নয়।তবে বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আ.ফ.ম আছাদুজ্জামান বলেন, এসব ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি।
সানশাইন/রাজ