সর্বশেষ সংবাদ :

আলু চাষিদের ঈদ আনন্দ ফিকে

স্টাফ রিপোর্টর: এবার রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে আলুর ফলন রেকর্ড পরিমাণ হয়েছে। মাঠজুড়ে সোনালি আলু, কিন্তু কৃষকের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। বাজারে দাম নেই, সংরক্ষণের জায়গা সংকট। ফলে লাভের আশায় আলু চাষ করা কৃষকদের অনেকেই এখন লোকসানের হিসাব কষছেন। আলুর দাম না থাকায় এবার ঈদ আনন্দ আলু চাষিদের জন্য ফিকে হয়ে এসেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার টন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে সংরক্ষণ নিয়ে। এই অঞ্চলের ২২১টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টন, যা উৎপাদিত আলুর মাত্র ২৩ শতাংশ সংরক্ষণ করতে পারবে।
ফলে বাকি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টন আলু কৃষকদের বাধ্য হয়ে বাড়িতে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে বা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে প্রচুর আলু আসায় দাম কমে গেছে, আর চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় অনেক জায়গায় ক্রেতাও মিলছে না। নওগাঁ সদর উপজেলার কৃষক আক্কাস আলী বলেন, আমি আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। প্রতি বিঘায় ৭০-৮০ মণ আলু হয়েছে। এখন বাজারে কেজিপ্রতি ১০-১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম। লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাই উঠবে না!
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার কৃষক জুলফিকার ফেরদৌস বলেন, আমরা কোল্ড স্টোরেজে জায়গা পাচ্ছি না। অনেকে বুকিং দেওয়ার পরও জায়গা মিলছে না। আর যারা পারছেন, তারা বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গত বছর সংরক্ষণ খরচ ছিল কেজিতে ৪ টাকা, এবার সেটা বাড়িয়ে ৮ টাকা করা হয়েছিল, পরে সরকার ৫.৭৫ টাকা নির্ধারণ করলেও লাভ তো কিছুই হচ্ছে না!
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চাষি রাশেদুল ইসলাম বলেন, বাজারে আলুর এত সরবরাহ যে ক্রেতাই নেই। ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে দাম কমিয়ে ফেলেছে। আমার প্রায় ২০০ মণ আলু বিক্রি করতে হচ্ছে লোকসান দিয়ে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আমার এক বিঘা জমির আলু বিক্রি করে ২৫ হাজার টাকার মতো পাবো, অথচ জমি ইজারা, সার, কীটনাশক, শ্রমিকসহ সব খরচ মিলিয়ে লেগেছে ৫০ হাজারের বেশি। এত কষ্ট করেও যদি লোকসান হয়, তাহলে চাষাবাদ করে কী লাভ?
রাজশাহীর রহমান কোল্ড স্টোরেজের ব্যবসায়ী কাজল জানান, এ বছর আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় স্টোরেজ ধারণক্ষমতা কমে গেছে। যাদের আগেভাগে বুকিং ছিল, তারা জায়গা পাচ্ছেন। কিন্তু নতুন বুকিং নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তানোরের চাষি সাইদুল ইসলাম বলেন, গত বছর বাজার ভালো থাকায় এবার বেশি জমিতে আলু চাষ করেছি। কিন্তু এখন বাজারে ক্রেতা নেই, আলু বিক্রি করেও ইজারার টাকা উঠছে না। সরকার যদি দ্রুত আলু রপ্তানির ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে কৃষকের লোকসান আরও বাড়বে। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে কৃষকেরা লোকসানের ধাক্কা সামলাতে পারেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোতালেব হোসেন বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আলুর ফলন আশানুরূপ হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে, যার ফলে দাম প্রত্যাশিত পর্যায়ে থাকছে না।


প্রকাশিত: মার্চ ২৪, ২০২৫ | সময়: ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ