গোদাগাড়ী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

স্টাফ রিপোর্টার, গোদাগাড়ী: জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার জাহাঙ্গীর বিরুদ্ধে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা হয়েছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জিন্নাতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। জাহাঙ্গীর আলমের নামে এক কোটি ১১ লাখ ৬৫ হাজার ১০১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে দুদক।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জাহাঙ্গীররে আয়বহির্ভুত এই সম্পদ খুঁজে পেয়েছে দুদক। মামলার তদন্ত চলাকালে আরও কোনও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলো অভিযোগপত্রে সংযুক্ত করা হবে।
গোদাগাড়ীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি পৌরসভার সারেংপুর মহল্লায়। এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে জমজমাট ছিল গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ করিডর। এই করিডরে কাজ করতেন জাহাঙ্গীর আলম। তারপর নিজেই ভারত থেকে গরু আনা শুরু করেন। গরু আনতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন হুন্ডি কারবারে।
পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময় তার এক আত্মীয় পৌরসভার মেয়র হলে তিনি ঠিকাদারী শুরু করেন। তখন এলাকার লোকজন তাকে যুবদল নেতা হিসেবেও চিনতেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে জাহাঙ্গীর আলম এলাকার এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। নিয়ন্ত্রণ নেন ঠিকাদারী ও খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহ সিন্ডিকেটের।
খুশি হয়ে ফারুক চৌধুরী তাকে তানোরের একটি কলেজের প্রভাষক হিসেবেও নিয়োগ দেন। এরপরই যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উপজেলা সভাপতির পদ পান। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জাহাঙ্গীরকে। ফারুকের ইচ্ছায় হয়ে যান উপজেলা চেয়ারম্যানও।
স্থানীয় লোকজন জানান, টিআর-কাবিখা থেকে বিপুল টাকা হাতিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পারভেজ মোশাররফ বাবু ও যুবলীগ নেতা কাওসার মাসুমের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিন হাজার টাকা করে আদায় করতেন উপকারভোগীদের কাছ থেকে।
এছাড়া কোনো নির্বাচন এলেই এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তুলতেন বিপুল অংকের টাকা। উপজেলা দলিল লেখক সমিতি থেকে কমিশন, ট্রলি ব্যবসায়ী সমিতি ও বালু মহল থেকেও বিপুল টাকা চাঁদা আদায় করেছেন এই যুবলীগ নেতা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধ পথে উপার্জন করা বিপুল টাকা জাহাঙ্গীর বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। গোদাগাড়ী আমতুলীতে বহুতল ভবন, রাজশাহীর নিউমার্কেটে সাবেক এমপি ফারুকের থিম ওমর প্লাজায় ৫০ লাখ টাকায় কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। কিনেছেন চারটি দোকানও। নিউমার্কেট এলাকায় একটি মুদি দোকানও কিনেছেন তিনি। গোদাগাড়ীতে ছিল গরুর খামার, আমতুলীতে বহুতল ভবন, এবং রড-সিমেন্ট, ইলেকট্রনিক্স, টাইলসের ও সু-এর ব্যবসা। নওগাঁয় ছিল কাপড়ের ব্যবসা। করেছিলেন প্রাইভেট মাদ্রাসাও।
গোদাগাড়ীতে জালিয়াতি করে খাসপুকুর দখলের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। উপজেলা সদরে জাহাঙ্গীর আলমের মার্কেট, আমতলী, হঠাৎপাড়া ও মাধবপুরসহ বিভিন্ন মৌজায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে সীমান্তের দিকে পালানোর চেষ্টা করেন জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় পদ্মা নদী দিয়ে নৌকায় পালানোর সময় স্থানীয়রা জাহাঙ্গীর ও তার ছেলে জিসানকে ধরে ফেলেন। এ সময় জাহাঙ্গীর আলমকে গণধোলাই দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে আহত অবস্থায় পালিয়ে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন জাহাঙ্গীর। তারপর আর তার খোঁজ নেই। তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেছেন বলে এলাকার লোকজন জানেন। কথা বলতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।


প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৫ | সময়: ৪:১০ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ