বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নিভৃত পল্লী গ্রাম হিন্দা কসবায় অবস্থিত ঐতিহাসিক হিন্দা শাহী জামে মসজিদটি স্থাপত্বের প্রাচীন সুনিপুন নির্মান শৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। মুঘল স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি এই মসজিদটি আজও সকলের কাছে দৃষ্টিনন্দন হয়ে দাড়িয়ে আছে। এছাড়া মসজিদের দেয়ালে বিভিন্ন রংয়ের কাঁচ, মার্বেল পাথর ও সিরামিকের টুকরো বসিয়ে অলংকরণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জানা গেছে এ মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন, চিশতীয়া তরিকার অন্যতম পীরে অলীয়ে কামেল ‘হয়রত খাজা শাহ মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল গফুর চিশতী (রহঃ)’। তিনি সদুর কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার পীর কাশিমপুর গ্রাম থেকে ষাটের দশকে অত্র এলাকায় চিশতিয়া তরিকার প্রচারের জন্য আস্তানা গড়ে তোলেন। সেই সময় অত্র এলাকায় ধর্মপ্রান মুসলমানগণ দলে দলে তার অনুসারী হতে থাকেন। তখন তিনি ওই এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি তার আস্থাভাজন খলিফা আব্দুল খালেককে সাথে নিয়ে বাংলা ১৩৬২ সনে মসজিদ নির্মানের কাজ শুরু করেন। মসজিদ নির্মাণের পুরোকাজ তদারকি করার দায়িত্ব দেন ঐ খলিফাকে। পুরো ৩ বছর বছর লেগে যায় সম্পুর্ন মসজিদটির নির্মাণ কাজে।
মসজিদটির দৈর্ঘ ৪৯.৫ ফুট, প্রস্থ ২২.৫ ফুট। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের সাথে মিল রেখে, পাঁচটি গম্বুজ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মসজিদটি। বড় গম্বুজটি রয়েছে মাঝখানে, বাঁকি চারটি গম্বুজ রয়েছে চার কোনায়, যা বড় গম্বুজটির সঙ্গে সংযুক্ত। মসজিদটির ছাদ পাঁচটি গম্বুজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলেও লক্ষ্যণীয়, এগুলো নির্মাণে কোন লোহার রড ব্যবহার করা হয়নি। মাঝখানের বড় গম্বুজের ভেতরের অংশে ‘আয়াতুল কুরসি’ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লেখা রয়েছে। মসজিদটির উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে চারতলা বিশিষ্ঠ ৪০ ফুট সু-উচ্চ একটি মিনার।
মসজিদটির পার্শে¦ চির নিন্দ্রায় শায়িত আছেন ‘শাহ্ এলেমজি (রহঃ)’ ও ‘শাহ্ কালেমজি (রহঃ)’। প্রতি বছর রবিউল আউয়াল চাঁদের ৯ তারিখে মসজিদ চত্বরে পবিত্র ওরশ মোবারক উপলক্ষ্যে হালকায়ে জিকির অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে উপজেলা ও জেলার বাইরে থেকে আসা প্রায় ২০-২৫ হাজার লোকের সমাগম ঘটে।
জয়পুরহাট জেলা সহ উত্তরবঙ্গে এ মসজিদটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। জেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বাইরের জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক নারী-পুরুষ প্রতিদিন মসজিদটি দর্শন করতে আসে। তবে এক্ষেত্রে মসজিদ দর্শনে এসে যাতায়াত সমস্যায়ও পড়ে লোকজন। ভারী যানবাহন না থাকায় উপজেলা সদর থেকে ৮-১০ কিলোমিটার রাস্তা রিক্সা-ভ্যান ও অটো যোগে আর্কষনীয় এ মসজিদ দেখার জন্য আসতে হয়।
এছাড়াও নিভৃত পল্লীতে অবস্থিত হওয়ায় থাকা-খাওয়ার সমস্যায়ও পড়তে দর্শনার্থীদের। দূরের কোন দর্শনার্থী এলে তাকে জয়পুরহাট শহরে রাত্রি যাপন করতে হয়। এজন্য এলাকা বাসী দীর্ঘদিন থেকে ক্ষেতলাল উপজেলা সদরে একটি মান সম্পন্ন ডাকবাংলো গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন। আর ডাক বাংলো স্থাপন করতে পারলে একদিকে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হবে অন্যদিকে দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত হবে হিন্দা শাহী জামে মসজিদটি এবং বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে অবদান রাখবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
মসজিদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল হাসান বলেন, এই মসজিদটি দেখতে এসে অনেকে এর নির্মাণ কৌশল দেখে অভিভূত হন। তবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও দিন দিন বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশা করেন।