সর্বশেষ সংবাদ :

৭৫ বছরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

রাজনৈতিক দলের ধারণা আধুনিক কালের সৃষ্টি-ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে ভারতবর্ষে কোন রাজনৈতিক দল ছিল না। ১৮৮৫ সালে গঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসই প্রথম রাজনৈতিক দল। পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে আরও অনেক রাজনৈতিক দল আমরা দেখি তবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এ দুটি দল উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রায় দুইশত বছর ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের শাসনাধীন থেকে ১৯৪৭ সালের কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে।

 

পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে বাঙালি মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ যেমন হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, খাজা নাজিম উদ্দিন সবাই পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন “তখন রাজনীতি শুরু করেছি ভীষণভাবে, সভা করি, বক্তৃতা করি, খেলার দিকে আর নজর নাই, শুধু মুসলিম লীগ আর ছাত্রলীগ। পাকিস্তান আনতেই হবে, নতুবা মুসলমানদের বাঁচার উপায় নাই। ” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: পৃষ্ঠা ১২)

 

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ডিসেম্বরে পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করার প্রস্তাব দিলে তা নাকচ হয়ে যায়। পাকিস্তানের জন্ম লগ্ন থেকে মুসলিম লীগ চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের হাতে। মুসলিম লীগ কাউন্সিলের মোট ৪৫৬ জন সদস্যের মধ্যে পূর্ব বাংলার জন্য নির্ধারিত করা হয় মাত্র ১৮০ জন। এইভাবে দলীয় নেতৃবৃন্দের স্বেচ্ছাচারিতা, পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দের অসন্তুষ্টি সৃষ্টি দলের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে । এ অবস্থায় দলের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা দল থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নেয়। এছাড়াও তখন পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক নীতি চ্যালেঞ্জ করার মত তখন কোন কার্যকর বিরোধী দল ছিল না। বাংলা ভাষা মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ প্রথম ধর্মঘট ও শেখ মুজিবুর রহমান সহ ছাত্র নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা” ঘোষণার প্রকাশ্য প্রতিবাদ, ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দানের অভিযোগে শেখ মুজিব সহ কয়েকজন কে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, এসবের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনের মুসলিম লীগের একাংশের কর্মী সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ও পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

 

নবগঠিত এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন জেলে। অসমাপ্ত আত্মজীবী জীবনীতে এই দল গঠনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি লিখেছেন – “আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য। আমি খবর দিয়েছিলাম, আর মুসলিম লীগের পেছনে ঘুরে লাভ নাই এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এরা আমাদের মুসলিম লীগে নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে৷ একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না এদের কোন কর্ম পন্থা নেই আমাকে আরো জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম ছাত্র রাজনীতি আমি করবো না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। না করার কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে দেশে একনায়কত্ব চলবে। ” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: পৃষ্ঠা ১২০)

 

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল মুসলিম লীগ সরকারের অত্যাচার অবহেলা শোষণ বঞ্চনার বিপরীতে পূর্ব বাংলার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে। বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে আওয়ামী লীগই বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক দল হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করলে সরকার তাকে গ্রেফতার করে জেলখানায় প্রেরণ করে। এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানায় থেকে ভাষার দাবির পক্ষে অনশন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মূল শক্তি ছিল আওয়ামী লীগ। শুরুতে মুসলিম শব্দটি দলের নামে যুক্ত থাকলেও দলকে অসাম্প্রদায়িক করার লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এবং ঐতিহাসিক সত্য এই যে, পরবর্তীকালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণআন্দোলন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগই নেতৃত্ব দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

 

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান করেন এবং ঘোষণা দেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ” ২৫ শে মার্চ গণহত্যার রাতের অব্যাহতির পরে ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। আওয়ামি লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রবাসী সরকার। বাঙালি দামাল ছেলেরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ করে অবশেষে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশে’ পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান লাভ করে।

 

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসেন । ১৯৭৩ সালের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলে আওয়ামী লীগের জন্য সেটি ছিল সবচেয়ে বড় দুঃসময় । আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন করতে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ সালে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে।

 

১৯৮১ সালের ১৭ই মে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নির্বাসনকাল থেকে দেশে ফিরে আসলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নতুনভাবে মোড় নেয়। এবং প্রায় দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামি লীগ পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পায়৷ বঙ্গবন্ধুকন্যা মোট পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে তার মধ্য একটানা চতুর্থবার। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য ঘোষণা করে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। তার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, যার লক্ষ্য স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার, এবং স্মার্ট সমাজ।

 

আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরের রাজনৈতিক কার্যক্রম শুধু বাংলাদেশকে অবাক করেনি বরং পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সাহসী ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের পরিণত হয়েছে।

 

মো: পারভেজ মোশাররফ

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


প্রকাশিত: June 24, 2024 | সময়: 1:21 pm | Daily Sunshine