আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার হবে

সানশাইন ডেস্ক: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার করা হবে। তবে, কতগুলো আসনে ইভিএম হবে, সেই বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। ইসি তার সক্ষমতা ও যৌক্তিকতা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসনে ইভিএম ব্যবহার করবে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রবিবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। যেসব আসনে ইভিএমের ব্যবহার হবে, সেখানে ব্যাপক প্রচারণা হবে বলেও জানান এই কমিশনার।
সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে কমিশনার মো. আলমগীর ইভিএমের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। ইভিএমের অসুবিধার চেয়ে সুবিধা বেশি বলেও তিনি দাবি করেন। এছাড়া ইভিএমের কারচুপি নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন তা প্রমাণে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও কেউ সেটা প্রমাণ করতে আসেনি বলে তিনি জানান। এদিকে বিএনপি ইভিএম নিয়ে অভিযোগ তুললেও তারা সংলাপে এসে বা অন্য কোনোভাবে ইসির কাছে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ না দেওয়ায় তা আমলে নেওয়া হয়নি। অপরদিকে, অন্য দলের মধ্যে যারা ইসিতে গিয়ে ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ দিয়েছে, তারা তা যাচাই করছে।
ইভিএমে ভোট কম পড়া ও কারচুপির অভিযোগকে অপপ্রচার দাবি করে মো. আলমগীর বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আপনি আমাকে বলবেন, আমি খারাপ। এর তো প্রমাণ দিতে হবে। না হলে আমি খারাপ হিসেবে গণ্য হবো কেন? তার মানে এটা অপপ্রচার। যতক্ষণ না আপনি প্রমাণ দেবেন ইভিএমে ভোট কারচুপি করা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তো আমি এটা বিশ্বাস করবো না। কারচুরির বিষয়টি হচ্ছে অভিযোগ, কিন্তু প্রমাণিত নয়। যারা অভিযোগ দিয়েছেন সেগুলো আমরা যাচাই করছি। কিন্তু যারা আমাদের কাছে এসে অভিযোগ দেননি, সেটা তো আমরা আমলে নেইনি।’
কত আসনে এবং কোন কোন আসনে ইভিএম হবে। কেন ইভিএম ব্যবহার হবে-সেই বিষয়ে আগামী সপ্তাহে বিস্তারিত জানানো হবে বলে তিনি জানান। এক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরে ১/২ তারিখে জানানো হতে পারে, এমন ইঙ্গিত দেন এই কমিশনার। ইভিএম বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে এই কমিশনার আলমগীর বলেন, ‘ইভিএম আমাদের কাছে স্পর্শকাতর কিছু নয়। এটি একটি সিস্টেম। ইভিএম ব্যবহার করে বেশ কিছু নির্বাচন হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে ইভিএমে ভোট হয়েছে। সেটা নিয়ে কোনও চ্যালেঞ্জ হয়নি। বা কেউ বলেননি, ইভিএমে এটা হয়েছে। সংসদের অনেকগুলো উপনির্বাচন ইভিএমে হয়েছে। কেউ বলেননি ইভিএমের কারণে আমি হেরে গেছি। বা চ্যালেঞ্জ করে কোর্টে মামলা করেছেন, সেটাও না। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে ইভিএমে ভোট হয়েছে— এটার একটা বিশাল অভিজ্ঞতা আছে আমাদের। আমরা দেখেছি, প্রায় ৬/৭শ’ টি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে। এখানে কোথাও বলা হয়নি- ইভিএমের কারণে আমরা ভোটে হেরে গেছি বা জিতে গেছি।’
তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের মধ্যে যারা টকশোতে অংশগ্রহণ করেছেন, তারা ইভিএমের পক্ষে বলেছেন। বলেছেন ইভিএমে ভোট হলে জাল-জালিয়াতি করা যায় না। ভোট ভালো হয়। অর্থাৎ ইভিএমের পক্ষে তারা বলেছেন। আবার কেউ বলেছেন, ইভিএমের প্রতি আমাদের আস্থা নেই। এটা আমরা এখনও বুঝি না। ইভিএমে জালিয়াতি করা যায়। তখন বলা হলো জালিয়াতি করা যায়, তার প্রমাণ দিয়ে যান। আপনারা থিওরিটিক্যালি বলেছেন। যেমন মনে করেন—একজন মানুষ চুরি করতে পারে। চুরি তো মানুষই করে। তাই বলে পৃথিবীতে এখন ৮শ’ কোটি মানুষ আছে সবাই কী চোর? ইভিএমে চুরি হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে যে ইভিএম আছে, সেটায় যে চুরি করা যায়, তার প্রমাণ দেন?’
ইভিএমের কারচুপির বিষয়ে ইসি চ্যালেঞ্জ দিলেও তাতে কেউ সাড়া দেয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কয়েকবার ওপেন চ্যালেঞ্জ দিলাম। লিখিতভাবে বললাম। সেই চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ তো প্রমাণ করতে পারেনি যে ‘আপনাদের যে ইভিএম তাতে চুরি করা যায়।’ মানুষ চুরি করে কিন্তু সব মানুষ চোর নয়। তেমনই আমাদের ইভিএমে যে কারচুরি করা যায়, তার প্রমাণ দেন। আমাদের ওই চ্যালেঞ্জ এখনও ওপেন আছে। এটা বন্ধ করিনি। আপনারা শুধু বাইরে থেকে বলেন—এটা এই-ওই তার ভিত্তিতে তো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। একটি প্রতিষ্ঠান চলে তার প্রমাণের ভিত্তিতে, তার দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। এজন্য ইভিএমের পক্ষ যেমন আছে, তেমনই বিপক্ষও আছে। আবার ইভিএমের অনেকগুলো সুবিধাও আছে। যেমন- এতে একজনের ভোট অন্যজন দিয়ে দিতে পারে না। ব্যালটে যেমন একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারে। ইভিএমে সেই সুযোগ নেই।’
ইভিএমের সুবিধা-অসুবিধার কথা উল্লেখ করে মো. আলমগীর বলেন, ‘ব্যালটে ভোটগ্রহণ করে সারা রাত ধরে ভোট গণনা করবেন। একবার ভুল হবে ১০ বার গণনা করবেন। ইভিএমে এসব ঝামেলা নেই। এতে অনেক সুবিধা আছে। আবার অসুবিধাও আছে, অনেকের আঙুলের ছাপ মেলে না। যাদের আঙুলের ছাপ মেলে না, তাদের জন্য তো একটি পদ্ধতি আছে। অনেকে বিশেষ করে বয়স্করা কীভাবে ইভিএম ব্যবহার করতে হয়, তা বুঝে উঠতে পারে না। মেশিন দেখে তারা ঘাবড়ে যান। অনেক সময় মনে হয়, এটা স্লো। তবে আসলে মেশিনটা স্লো নয়। যারা জানেন তাদের তো ১৫ সেকেন্ড লাগে ভোট দিতে।’
সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার আলমগীর বলেন, ‘ইভিএম ব্যবহার হবে। কিন্তু কত আসনে হবে সেই বিষয়ে আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পরিনি। এটা নিয়ে আমরা মতবিনিময় করছি। আলোচনা করছি। আমাদের সক্ষমতা কী আছে। কত ইভিএম আছে। আমাদের প্রশিক্ষিত জনবল কত আছে? সাপোর্টিং জনবল কত আছে? এগুলো দেখছি। এগুলো দিয়ে কত আসনে ভোট করা যাবে। আর যদি বেশি করতে চাই। আরও কত (ইভিএম মেশিন) লাগবে। তাতে কত টাকা লাগবে। এজন্য নতুন প্রজেক্ট নিতে হবে কিনা? সেই সময় আমাদের আছে কিনা? প্রকিওরমেন্ট করতে, প্রশিক্ষণ দিতে— এসব নিয়ে আলোচনা চলছে। এই মুহূর্তে ৭০ থেকে ৮০টি আসনে ভোট করতে পারবো। তবে আমরা কতটি আসনে ভোট করবো, সেটা এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি। সক্ষমতার ওপর সিদ্ধান্ত নেবো।’
তিনি জানান, অনেক রাজনৈতিক দল ৩০০ আসনে চায়, আবার কোনও কোনও দল একটি আসনেও চায় না। আমরা তো সবার কথা সমানভাবে গুরুত্ব দিতে পারবো না। আমরা আমাদের সক্ষমতা ও ইভিএমের যৌক্তিকতার ওপর গুরুত্ব দেবো। যেসব দল তিনশ’ আসনে ইভিএম ব্যবহারের দাবি করেছেন, সেটার প্রতি গুরুত্ব দেবেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। আমরা কারও মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেবো না। আমরা একটি সুষ্ঠু ও সুন্দরভোট করার জন্য সক্ষমতা ও ইভিএমের সুবিধা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবো।’
সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও সংসদের বাইরে বড় দল বিএনপি ইভিএমের বিপক্ষে মত দিয়েছে—এ বিষয়ে ইসির অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা কেন ইভিএমের বিপক্ষে বলেছেন, সেটা আমরা বলতে পারবো না। রাজনৈতিক ব্যাপার তো, খোলাসা করে বলবে না। রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে। আর বিএনপি তো আমাদের আলোচনায় আসেনি। ইভিএম নিয়ে তারা যেটা প্রচার করে, সেটার প্রমাণ দিতে বলেছিলাম তাও তারা দেয়নি। আপনি যখন আদালতে এসে সাক্ষী দেবেন না। প্রমাণ দেবেন না। সেখানে আমরা কতটুকুই-বা গুরুত্ব দিতে পারি? তাদের তো ক্লিয়ার করতে হবে।’
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে ইসির হাতে ভোট বাতিলের বিধান যুক্ত করে সংশোধনী প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, ‘আমাদের আরপিও সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যথেষ্ট। তারপরও কিছু কিছু জায়গায় একটু অস্পষ্টতা আছে। আমাদের মনে হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছু কিছু জায়গায় যদি সংশোধন করা হয়, তাহলে বিষয়টি আরও ভালো হবে। কমিশন মনে করেছে, অল্প কয়েকটি জায়গায় পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারলে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোতে দেখি, সেটা মোকাবিলা করা সহজে সম্ভব হবে। নির্বাচনে গুরুতর কোনও অনিয়ম হলে ওই নির্বাচন স্থগিত করতে পারে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ওই নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা বিদ্যমান আরপিওতে নেই।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ, বিভিন্ন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে— তার আলোকে আমরা মনে করেছি, ব্যাপক অনিয়ম হলে ওই নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন করতে হবে। যে কারণে আমরা মনে করেছি, বাতিল করার ক্ষমতা ইসির হাতে থাকা উচিত। তবে কেউ অভিযোগ করলেই বাতিল হবে তা নয়। ইসির কাছে যদি যথেষ্ট প্রমাণ থাকে এবং তা যথাযথভাবে তদন্ত হবে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তা বাতিল করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় রিটার্নিং অফিসার ফলাফল ঘোষণা করেন। তাহলে আর বাতিল করার সুযোগ নেই। এই বিধান যুক্ত হওয়ার পর আমরা যদি যৌক্তিক ক্ষেত্রে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেই, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের লায়াবেল করতে পারবে। নির্বাচনের দিনে নির্বাচনটি যদি এমনভাবে হয় যে, সুষ্ঠু ফলাফল আসবে না। সেক্ষত্রে ইসি যাতে বাতিল করতে পারে।’
পুনর্র্নিধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আইনের বিধান অনুযায়ী, তিনটি শর্তের আলোকে আমরা এটা করবো। এ বিষয়ে আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে। হোমওয়ার্ক করে রাখছি। ফাইনাল রিপোর্ট পাওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু হবে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন হবে কী হবে না, সেবিষয়ে কিছুই বলা যাবে না। আইনের ক্রাইটেরিয়ায় যেটা আসবে, তাই হবে। আমরা তো আইনের বাইরে যেতে পারবো না। জনসংখ্যাসহ তিনটি ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী বাড়তে কমতে পারে। আবার সেটা নাও হতে পারে। প্রশাসনিক অখণ্ডতার একটি আসন দুটি উপজেলায় যাতে না হয়, সেটা আমরা দেখবো।


প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২২ | সময়: ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর