, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আজ শুক্রবার থেকে সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ আয়োজিত এটি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। শুক্রবার সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী। রাবি উপাচার্য প্রফেসর মো. ফরিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মো. আব্দুল আলিম ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মামুনুর রশীদ। সম্মেলনের আহ্বায়ক প্রফেসর বেগম আসমা সিদ্দীকা স্বাগত বক্তৃতা দেন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর সাঈদা আঞ্জু।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই সম্মেলনের বিষয়বস্তু অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। এর পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের বেলায়ও প্রযোজ্য। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন বিভিন্ন অঞ্চল ও পটভূমির পেশাজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এখানে তারা পারস্পরিক আলোচনা, গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে মতবিনিময় এবং সার্বভৌমত্বের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি, মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা, তথা একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে আইনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন। এই সম্মেলন সার্বভৌমত্ব, মানবিক মর্যাদা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনের ওপর আরও গবেষণাকে অনুপ্রাণিত করতে ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান বিশ্বে সার্বভৌমত্বের কঠোর ধারণা আজ অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে। কোনো সমস্যাই আজ আর একটি মাত্র ভূখণ্ডের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই ও থাকেনা। ফলে, একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অর্থ কেবল নিজের ইচ্ছেমতো চলার স্বাধীনতা নয়, বরং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়ার দায়িত্বও বটে। সার্বভৌমত্ব বা রাষ্ট্রীয় আইন—কোনোটিই মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবতার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। এই সম্মেলনের আলোচনা থেকে বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের একটা রূপরেখা পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি উপাচার্য প্রফেসর মো. ফরিদুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, সমসাময়িক বিশ্বে সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইনের ধারণাগুলো একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিশ্বায়ন, সশস্ত্র সংঘাত, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, অসমতা এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এমন এক সময়ে এই চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করতে এবং কার্যকর আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ খুঁজে বের করতে একাডেমিক আলোচনা ও আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা একান্ত প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে এই সম্মেলন থেকে দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই সম্মেলনের উপস্থাপিত প্রবন্ধ ও আলোচনাগুলো আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। এই আয়োজন দেশি-বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মো. আব্দুল আলিম তাঁর বক্তব্যে বলেন, সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন—এই মৌলিক ধারণাগুলো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, সম্প্রদায় এবং ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ককে রূপ দেয়। সশস্ত্র সংঘাত, বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, অসমতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের এই সময়ে, ন্যায়বিচার, শান্তি, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার বজায় রাখার ক্ষেত্রে আইনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, এই সম্মেলন বিচারব্যবস্থা ও অ্যাকাডেমিক পটভূমির পণ্ডিত, পেশাজীবী, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান বিনিময়, উদ্ভাবনী গবেষণা উপস্থাপন এবং গঠনমূলক আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ ধরনের একাডেমিক সম্পৃক্ততা সমসাময়িক আইনি চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে গভীর ধারণা দিতে এবং কার্যকর ও টেকসই আইনী সমাধান খুঁজে বের করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও তিনি বলেন।
অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মামুনুর রশীদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, সার্বভৌমত্ব, মানবতা ও আইন নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা যখন এখানে সমবেত হয়েছি, তখন আমাদের জাতির যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ এক সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা দেশ, যেখানে বিভিন্ন যুগে দূরদর্শী নেতৃবৃন্দ জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্বের নীতিগুলোকে সুসংহত করেছেন।
এই সম্মেলনে শিক্ষাবিদ, গবেষক ও আইন বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করার মাধ্যমে আমরা জ্ঞান বিনিময়ের একটি অনন্য পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছি। এখানে যে আলোচনা ও অন্তর্দৃষ্টি উঠে আসবে, তা আইন বিষয়ক গবেষণার পরিধিকে আরও প্রসারিত করবে ও বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক, বিচারক, আইন পেশাজীবী, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রফেসর বেগম আসমা সিদ্দীকার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্লিনারি সেশন। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি ল স্কুলের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. মো. রফিকুল ইসলাম ও মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ের আইন অনুষদের প্রফেসর দাতিন মেরি জর্জ। উপস্থাপিত প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর নকীব মু. নসরুল্লাহ ও রাবি আইন বিভাগের প্রফেসর আবু নাসের মো. ওয়াহিদ। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ৪টি অ্যাকাডেমিক সেশনে ১২৪টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হবে বলে নির্ধারিত আছে। বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম রিদওয়ান জুনায়েদ ও তাসনিম তাইয়েবা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।