সর্বশেষ সংবাদ :

এডব্লিউডি প্রদর্শনীতে অনিয়মের অভিযোগ

রাণীনগর প্রতিনিধি: নওগাঁর রাণীনগরে কৃষকদের জন্য নেওয়া পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) প্রযুক্তির প্রদর্শনীতে বরাদ্দের উপকরণ কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রদর্শনীর জন্য নির্ধারিত সব উপকরণ ও শ্রমিকের খরচ তাঁরা পাননি। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে সহায়তা না পাওয়ায় প্রদর্শনীর কাঙ্ক্ষিত সুফলও মেলেনি। এ ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত শুরু করেছে কৃষি বিভাগ। তবে তদন্তের অগ্রগতি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পার্টনার ফিল্ড স্কুল প্রকল্পের আওতায় বোরো মৌসুমে পানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এডব্লিউডি প্রযুক্তির চারটি প্রদর্শনী নেওয়া হয়। প্রতিটি প্রদর্শনীর আওতায় দুই একর করে মোট আট একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিটি প্রদর্শনীর জন্য বিভিন্ন কৃষি উপকরণ ও আনুষঙ্গিক খরচসহ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল।
কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ অনুযায়ী উপকরণ না দিয়ে কম পরিমাণে দেওয়া হয়েছে। প্রদর্শনীর জন্য সরকার কী কী উপকরণ ও সুবিধা বরাদ্দ করেছে, তা তাঁদের জানানো হয়নি। ফলে তাঁরা প্রাপ্ত উপকরণ দিয়েই কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়া এডব্লিউডি প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়মকানুন সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, উপকরণ পেয়েছেন কম: উপজেলার কালীগ্রাম কসবাপাড়া গ্রামের বাবু সরদার, চকবলরাম গ্রামের ওসমান আলী ও জলকৈ গ্রামের কামরুল ইসলাম তাঁদের প্রদর্শনীর জন্য বরাদ্দ করা উপকরণের তুলনায় কম পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ইউরিয়া সার তিন বস্তা, ডিএপি সার দুই বস্তা, এমওপি সার ১০০ কেজি, জিংক সালফেট পাঁচ কেজি, জিপসাম ৪০ কেজি, জৈব সার ৮০ কেজি এবং বোরনের কয়েকটি ছোট প্যাকেট পেয়েছেন। বালাইনাশক ও আগাছানাশক বাবদ আনুমানিক ৩০০ টাকার ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ড্রামও দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা জানান। তবে শ্রমিকের খরচ দেওয়া হয়নি এবং সাইনবোর্ড স্থাপনের জন্য বাঁশ নিজেদের টাকায় কিনতে হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
কৃষক ওসমান আলী বলেন, শ্রমিকের খরচ তো পানইনি, উল্টো নিজের টাকায় বাঁশ কিনে সাইনবোর্ড টাঙাতে হয়েছে। সার ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, বীজ পেয়েছেন, কিন্তু বীজ শোধনের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ পাননি। তাঁর ভাষ্য, কোন খাতে কী পরিমাণ উপকরণ বরাদ্দ ছিল, তা আগে জানানো হয়নি। যা দেওয়া হয়েছে, তা-ই নিতে হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, বীজ ছাড়া অন্যান্য উপকরণের বেশ কিছুই তাঁরা বরাদ্দের তুলনায় কম পেয়েছেন। তবে বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও সরেজমিন যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তদন্ত শুরু, বক্তব্য দিতে অনীহা কর্মকর্তাদের: প্রদর্শনীর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং উপকরণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত শুরু করেন। চলতি বছরের গত ২৫ আগস্ট চারজন কৃষককে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ে ডেকে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. মেহেদুল হাসান বলেন, তিনি কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন। এডব্লিউডি প্রদর্শনী নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে কৃষকেরা কী বলেছেন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অন্য একজন উল্লেখ করে এ বিষয়ে উপপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে, নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি। তিনি রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুনের পক্ষে বক্তব্য দেন। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয় তাঁরা বিবেচনায় নিয়েছেন এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। তবে উপকরণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
এদিকে, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম তদন্ত শুরুর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, যেসব অভিযোগ ছিল, সেসব বিষয়ে জেলার কর্মকর্তারা কৃষক সহ সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শুনেছেন। উপকরণ সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে বলেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বরাদ্দ ও বিতরণ যাচাইয়ের দাবি: সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দুই একরের প্রদর্শনীর জন্য বীজ, বীজ শোধক, ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি, জিংক সালফেট, জিপসাম, বোরন, জৈব সার, বালাইনাশক, আগাছানাশক, এডব্লিউডি পাইপ, শ্রমিকের খরচ, ড্রাম ও সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন উপকরণ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বরাদ্দ ছিল। পাশাপাশি পরিবহন, মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি বিষয়ে ধারণা প্রদান এবং অন্যান্য খাতেও অর্থ বরাদ্দের কথা জানা গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দের সব উপকরণ ও সুবিধা তাঁরা পাননি। অন্যদিকে, বরাদ্দপত্র, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, উপকরণ বিতরণের রেজিস্টার, কৃষকদের স্বাক্ষর এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
কৃষি বিভাগের এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বোরো ধান চাষে পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানির সাশ্রয় করা। অভিযোগ রয়েছে, কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না দেওয়ায় রাণীনগরে প্রদর্শনীগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকি, উপকরণ বিতরণের স্বচ্ছতা এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


প্রকাশিত: October 11, 2026 | সময়: 6:42 am | সুমন শেখ