, , ।
নুরুজ্জামান :
এক কাপ চা , হাতে একটি খবরের কাগজ , একসময় এভাবেই শুরু হতো অনেকের সকাল। পরিবারের কেউ পড়তেন প্রথম পাতার খবর, কেউ খেলাধুলা , কেউ সাহিত্য-সংস্কৃতি ,আবার কেউ মনোযোগ দিতেন সম্পাদকীয়তে। এখন সময় বদলেছে। চাইলেই মুঠোফোনে মুহুর্তের মধ্যে দেশ-বিদেশের খবর পাওয়া যায় । তারপরও ছাপা সংবাদপত্রের প্রতি পাঠকের আগ্রহ একেবারে কমেনি। বরং বদলেছে পাঠকের প্রত্যাশা। এখন পাঠক শুধু খবর চান না , চান বিশ্বাসযোগ্যতা, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী রিপোর্ট ও ফিচার সহ নতুন কিছু ।
পাঠকরা জানান, এখন মুঠোফোনের পর্দায় মুহূর্তের মধ্যেই দেশ-বিদেশের খবর পাওয়া যায়। অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারাক্ষণই আসছে নতুন নতুন আপডেট সংবাদ। ফলে খবর জানার জন্য পরদিন সকালের পত্রিকার অপেক্ষায় থাকতে হয় না। তবুও ছাপা সংবাদপত্রের প্রতি পাঠকের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায়নি। বরং বদলে গেছে সেই আগ্রহের ধরন, বদলে গেছে প্রত্যাশা। এখন পাঠক শুধু খবর চান না, তার সঙ্গে চান কিছু সংবাদ । কারন এ গুলো তাঁরা সংরক্ষন রাখতে চান।
সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সংবাদপত্র মানুষের জীবন ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এ অঞ্চলেও সংবাদপত্রের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। রঙ্গপুর বার্তাবহ(স্থান রংপুর),কুষ্টিয়ার কাঙাল হরিনাথ, মজুমদারের ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ উনিশ শতকে গ্রামীণ মানুষের কথা তুলে ধরে, সংবাদপত্রের সামাজিক ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের সংবাদপত্রও সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের নানা বিষয়কে তুলে ধরছে।
তবে বর্তমানে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় শুধু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়-রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা, কৃষি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনযাপন, শিল্প-বাণিজ্যসহ নানা বিষয় স্থান পায়। পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন আয়োজন। তারপরও পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, অন্য পত্রিকার চেয়ে এখানে নতুন কী আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা বলা হয়, তিনটি বহুলপঠিত দৈনিকের তিনজন পাঠকের সঙ্গে ।
দৈনিক ইত্তেফাকের পাঠক ও ব্যবসায়ী দুলাল হোসেন বলেন , এই পত্রিকাটির ভাষা তাঁকে বেশি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে সম্পাদকীয় অংশে সাধু ভাষা এবং অন্যান্য সংবাদে কথ্য ভাষার ব্যবহার তাঁর কাছে ভালো লাগে। এ ছাড়াও মাঝে মধ্যে কিছু বিশেষ রিপোর্ট তাকে মুগ্ধ করে । তবে তিনি সপ্তাহে অন্তত একদিন বিষয়ভিত্তিক বিশেষ প্রতিবেদন চান। নতুন কোনো ভালো মানের পত্রিকা বাজারে এলে সেটিও পড়বেন বলে জানান তিনি।
প্রথম আলোর পাঠক রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ইংরেজর সহকারি অধ্যাপক শাহিন মাহমুদ শিমুল তাঁর পেশা দারিত্রের পাশা-পাশি নিয়মিত ইংরেজি পত্রিকাও পড়েন। তারপরও প্রথম আলোর প্রতি তাঁর আলাদা দুর্বলতা রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক প্রতিবেদন এবং ‘বন্ধুসভা’র কার্যক্রম তাঁকে আকর্ষণ করে। তবে নতুন কোনো পত্রিকা যদি অন্যদের তুলনায় নতুনত্ব ও ভিন্নধর্মী আয়োজন নিয়ে আসে, সেটিও পড়তে তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
সমকালের পাঠক ব্যবসায়ী দুলাল হোসেনের মতে, সমকালের বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন স্বচ্ছ। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের খবর প্রকাশ করাও তাঁকে আকর্ষণ করে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ায় বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে পছন্দের পত্রিকা থাকার পরও তিনি নতুন কোনো পত্রিকার প্রত্যাশা করেন। এখানে তিনজন পাঠকের পছন্দ তিন রকম। কারও কাছে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ, কারও কাছে বিষয় ভিত্তিক প্রতিবেদন, আবার কারও কাছে সংবাদ উপস্থাপনের স্বচ্ছতা। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশার জায়গায় রয়েছে একটি বড় মিল-নতুনত্বের আকাঙ্ক্ষা।
এটাই বর্তমান সংবাদপত্রের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। একসময় একটি পত্রিকার সঙ্গে অন্য পত্রিকার প্রতিযোগিতা ছিল মূলত পাঠক ও প্রচারসংখ্যা নিয়ে। এখন সেই প্রতিযোগিতার পরিধি অনেক বড়। সংবাদপত্রকে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তাৎক্ষণিক সংবাদ পরিবেশনের বিভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গে। তবে দ্রুত খবর প্রকাশ করাই সংবাদপত্রের একমাত্র শক্তি নয়। বরং ছাপা সংবাদপত্রের বড় শক্তি হতে পারে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন। পাঠক এখন শুধু জানতে চান না কী ঘটেছে, জানতে চান কেন ঘটেছে, এর পেছনের কারণ কী এবং এর প্রভাবই বা কতটা।
তাই পাঠককে ধরে রাখতে হলে সংবাদপত্রকে শুধু বেশি খবর প্রকাশ করলেই হবে না। দিতে হবে যাচাই করা ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ এবং ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা। একই সঙ্গে পাঠকের পরিবর্তিত রুচি ও চাহিদাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অনেকেই বলেন, সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ বলা হয় । সেই দর্পণে যেমন সমাজের বর্তমান চিত্র ফুটে ওঠে, তেমনি সময় পরিবর্তনের কথাও ছাপও পড়ে। তাই সময়ের সঙ্গে সেই দর্পণের ভাষা, বিষয় ও উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসতে হবে।পাঠক তাঁর প্রিয় পত্রিকার প্রতি আস্থাশীল থাকেন। কিন্তু সেই আস্থার পাশাপাশি নতুন কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তাঁর মধ্যে সবসময় কাজ করে। আর এই আকাঙ্ক্ষাই সংবাদপত্রের জন্য একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
আজকের পাঠকের চাওয়া তাই খুব সহজ-খবরের কাগজে খবর থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন বিশ্লেষণ এবং নতুন কিছু জানার সুযোগ। পাঠকের এই প্রত্যাশাকে ধারণ করতে পারলেই ছাপা সংবাদপত্র নতুন সময়ের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পাশাপাশি তার পুরোনো আবেদনও আরও শক্তভাবে ধরে রাখতে পারবে।
সানশাইন /শাহজাদা