, , ।
সানশাইন ডেস্ক: সংস্কার প্রশ্নে বাহাত্তরের সংবিধানকে সামনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “জুলাই সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের ক পার্টের পরতে পরতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন করে এ কাজগুলো করতে হবে। তার মানে আমি বাহাত্তরের সংবিধানকে এডাপ্ট করে নিলাম। আমি যা কিছু করি না কেন, বাহাত্তরের সংবিধানকে সামনে রেখে আমাকে এগিয়ে দিতে হবে। এটা হল আমার জুলাই সনদের একটা পার্ট।”
সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে এ সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। আইনমন্ত্রী বলেন, “যারা বলছিলেন, বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে (সংস্কার) করতে হবে, সেটা করলে আমি এক লাইনে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার বাহাত্তরের সংবিধান যতক্ষণ আছে, এই সংবিধানকে আমার সংশোধন করতে হবে। সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যেয়ে জুলাই সনদকে আমার সামনে রাখতে হবে, যে কেন্দ্রগুলোতে আমরা সংস্কারের জন্য স্বাক্ষর করেছি।”
এ সময় আইনমন্ত্রী বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেওয়া ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, “এই আদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” ‘অধ্যাদেশ’ না দিয়ে ‘আদেশ’ দিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা সংবিধান সংশোধনের সমপরিমাণ যদি কিছু হয়, তাহলে সেটা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের কোনো অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না, যেটা সংবিধান সংশোধনের সমকক্ষ হয়। এ কারণে উনারা অধ্যাদেশে না যেয়ে আদেশে গেলেন।
“তাহলে এই আদেশের লিগাল স্ট্যাটাসটা কি? সংবিধানের থার্ড শিডিউলে এই ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা ১৯৭২ সালে যেদিন এই সংবিধান অপারেশন আসছে, সেদিন থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। বাহাত্তরে রাষ্ট্রপতির আদেশ দিয়ে কিছু আইন করে গিয়েছিল, তাদের স্ট্যাটাস আইন। কিন্তু তখন যে বলে দেওয়া হল, এই সংবিধান যেদিন থেকে কার্যকর হল তারপর থেকে রাষ্ট্রপতির এ ধরনের আদেশ দেওয়ার আর কোনো ক্ষমতা থাকবে না।”
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, “আইন পাশ হবে সংসদে, যখন সংসদ থাকবে না তখন অধ্যাদেশ জারি হবে।” অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ দিয়ে ‘বিভাজন তৈরির রাস্তা’ রেখে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরে আইনমন্ত্রী তার পূর্ববর্তী কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গত শনিবার সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু দলের একজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাদের সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম ভূঁইয়া।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “এ রকম কোনো আইন নাই; যতক্ষণ আপনার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচিত না হয়। যেহেতু আপনার দল নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা নয়, প্রোগ্রাম আয়োজন করবেন এবং সরকারের সমালোচনা সেখানে করবেন। সরকারের স্তুতি বাক্য পাঠ করার জন্য আপনারা নিশ্চয়ই রাজনীতি করেন না।
“আপনাদের সেটা অধিকার আছে, সে অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিষয়গুলো আশা করি আমরা অ্যাড্রেস করব।” এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন তার বক্তব্যের সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রসঙ্গ টানেন। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, “তারা প্রথম অধিবেশনেই ১৭ সদস্যের একটি কমিটি করতে চেয়েছেন। যেখানে বিএনপির ৭ জন, বিরোধী জোটের ৫ জন ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৫ জন থাকবে।
“বিরোধী দলকে বললাম, আপনারা পাঁচজনের নাম দেন, উনারা পরবর্তী অধিবেশনে দিতে চাইলেন। আমরা দফায় দফায় মিটিং করেছি, সেই নামগুলো পাইনি। আমরা কমিটি একটা করেছি ১২ সদস্যের। এখন আশা করি, তারা যদি নামগুলো দেন আমরা তা নিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য সংস্কারের পথ ধরে আমরা এগোব। সেখানে আপনাদের যে কোনো বক্তব্যকে আমরা অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করব, যদি যৌক্তিক হয়।”
এর বাইরে মন্ত্রী মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তার ভাষ্য, “আমরা সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি, সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। আমাদের গতি স্লো হতে পারে, আপনারা পরিসংখ্যান দেখেন, গত ছয় মাসের মধ্যে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং এর অবস্থা কি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ‘গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি তখন অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলাম। অ্যাটর্নি জেনারেল কখনো আইনের ভেটিংয়ের সাথে যুক্ত থাকেন না। যে আইনে গুমের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সাধারণ আদালতে বিচারের বিধান রাখা থাকলেও কোনটি কোন আদালতে হবে সুনির্দিষ্ট ছিল না। এমনকি এই আইনের সর্বোচ্চ সাজার কথা থাকলেও সর্বনিম্ন সাজার কথা ছিল না। বিচ্যুতিগুলো ঠিক করার জন্য আইনটি সংসদে তোলা হয়েছিল।
“একাউন্টেবিলিটির জায়গাটা আমরা তৈরি করার চেষ্টা করছি। আমরা এটা প্র্যাকটিসে দিয়ে আমরা দেখি কতটুকু সফল হতে পারি। যদি সাকসেসফুল না হতে, আমরা সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত। আইন তো কোরান বা বাইবেল না যে, পরিবর্তন করতে পারব না। আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, “এখন যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমরা এত সমালোচনা করি। সেই সরকারে তো উনি (বর্তমান আইনমন্ত্রী) ছিলেন সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। তার পরামর্শ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার কোনদিকে অগ্রসর হতে পারে নাই এবং অন্তর্বর্তী সরকার তাকেই পছন্দ করেছে। এতদিন যিনি এসব কাজ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ হয়ে। এখন আবার উনি এসে এ সরকারের পক্ষ হয়ে বলেন, আমার এত ক্ষমতা নাই। তখনই আমরা দেখেছি, কি ক্ষমতা আপনার ছিল?”
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর অভিযোগ, “আমরা আস্তে আস্তে দেখেছি, জুলাইয়ের মধ্যে সেই চেতনাধারী অনেক ব্যক্তি হারিয়ে যাচ্ছে কমপ্লিটলি। আবার জুলাই চেতনাটাও হারিয়ে যাচ্ছে।” সংস্কারের মধ্যে সবচেয়ে জরুরি ছিল বিচারবিভাগের সংস্কার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, “আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করিনি, গণভোটের আমরা বিরোধিতা করেছি। গণভোট হবে সংবিধান সংশোধনের পরে। কারণ এখানে একটা ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল এবং প্রকাশ্যে বাহাত্তরের সংবিধানকে উড়িয়ে দেওয়া।”
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলী রিয়াজের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। সংবাদ মাধ্যম ‘চর্চা’-এর সম্পাদক সোহরাব হাসান দেশের বর্তমান পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সরকারি দল নীরব, বিরোধী দলও। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে সরকারের অভিমুখ কোথায় সেটা আমরা জানি না। যখন ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হল, তখন আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটা বিবৃতি দেওয়া হল, যেন ইরানই এই যুদ্ধের জন্যে দায়ী।”
সবশেষে বক্তব্যে বর্তমানের জ্বালানি সমস্যাকে পূর্ববর্তী সরকারের ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের’ ফল বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তার মতে, আমদানীনির্ভর নীতি না করে যদি আগের সরকার গ্যাসের মত জ্বালানি উত্তোলনে মনোযোগ দিত, তাহলে এমন সংকট হত না।