, , ।
সানশাইন ডেস্ক: অবশেষে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর। তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে রাষ্ট্রপতির মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়। পদত্যাগের কারণ প্রসঙ্গে পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লেখেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে।
তার নতুন রোগ শনাক্তের কথা জানিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘ইদানিং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই।
রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সাহাবুদ্দিন চুপ্পুই একমাত্র ব্যক্তি যিনি রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও এতদিন শীর্ষ কোনো সাংবিধানিক পদে বহাল ছিলেন। আওয়ামী লীগ, অন্তবর্তী সরকার এবং সবশেষ বিএনপি; তিন সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির অপসারণ নিয়ে বেশ আন্দোলন ও আলোচনা ছিল। একটি রাজনৈতিক দলের বাধায় সে যাত্রায় টিকে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় তার পদত্যাগ বা অপসারণ নিয়ে বেশ কয়েকবার গুঞ্জন হলেও এবার তা সত্যি হলো।
এদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার বিদায় যতটা সাংবিধানিক ঘটনা, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। কারণ তার উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থা। বিদায়ের সঙ্গেও রয়ে গেল সেই আস্থারই ছায়া ‘ফোনালাপ বিতর্ক’।
দুদকের কমিশনার থেকে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান। সেখান থেকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য। তারপর রাষ্ট্রপতি। তার উত্থান যেমন ছিল দ্রুত, ঠিক তেমনই বিতর্কও ছিল প্রায় প্রতিটি বাঁকে। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে যে আলোচনা শুরু, তা শেষ হয়েছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র, বঙ্গভবন ঘেরাও, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং অসমাপ্ত মেয়াদে বিদায়ের মধ্যদিয়ে।
সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক পরিচয় কখনও গোপন ছিল না। পাবনায় ছাত্রলীগ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কারাবরণ করেছেন। পরে বিচার বিভাগে যোগ দেন। জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তদন্তে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত কমিশনের প্রধান ছিলেন।
২০১১ সালে তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার করা হয়। মেয়াদ শেষে হন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। ২০২৩ সালে সেই দলই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দুদকে তার সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্র। বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা এবং কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে ঘুষের ষড়যন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাদের হাতে আছে।
তখন সরকারের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট না হয়ে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলারের ঋণ বাতিল করে। পরে পদ্মা সেতুসংশ্লিষ্ট অসদাচরণের কারণে এসএনসি-লাভালিন ও এর শতাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। ওই সময় সাহাবুদ্দিন ছিলেন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) এবং সংস্থাটির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখগুলোরও একজন।
২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। কিন্তু তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে আসামি করা হয়নি। তখন এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা লুইস মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল বলেছিল, আবুল হোসেনকে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করার মতো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ ও উপাদান ছিল।
এসএনসি-লাভালিনের নথি, সম্ভাব্য ঘুষের হিসাব এবং পরামর্শক নিয়োগে মন্ত্রীর ভূমিকা তুলে ধরে প্যানেল দুদকের ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছিল। তাদের ভাষ্য ছিল, আবুল হোসেনকে বাদ দেওয়ার কিছু যুক্তি প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোথাও বাংলাদেশের আইনের বিকৃত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। দুদক তারপরও আবুল হোসেনকে বাদ দিয়েছিল।
মো. সাহাবুদ্দিন দুদকের তদন্ত বিভাগের কমিশনার হিসেবে তখন বলেছিলেন, দেশের আইন ও বিদেশের আইনের ব্যাখ্যা এক নয়। তিনি একপর্যায়ে দাবি করেন, মামলা দায়েরে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল সন্তুষ্ট। ওই সময়ের দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান পরে বলেছেন, প্যানেল সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি— কোনোটিই তাকে জানায়নি। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও সাহাবুদ্দিনকে আলোচনায় নিয়ে আসে।
পদ্মাসেতু-সংক্রান্ত সেই মামলার প্রায় ২০ মাস তদন্তের পর ২০১৪ সালে দুদক জানায়, দুর্নীতি বা ঘুষের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেয় দুদক। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই সেই মামলার সাত আসামির সবাই অব্যাহতি পান। কমিশনার হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনও সেই সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন। পরে কানাডার আদালতেও এসএনসি-লাভালিনের তিন সাবেক কর্মকর্তা খালাস পান। আওয়ামী লীগ ও সরকার এটিকে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের দলিল হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়াটি ছিল কিছুটা ভিন্ন। আদালত গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যারট্যাপ প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয় বলে বাদ দেন। এরপর প্রসিকিউশন আর সাক্ষী বা প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। ফলে ফৌজদারি অভিযোগ আদালতে টেকেনি। সুতরাং কানাডার রায়কে বাংলাদেশের তদন্তে ওঠা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বলা কঠিন। বিশ্বব্যাংকের প্রশাসনিক অনুসন্ধানের মানদণ্ডও ফৌজদারি আদালতের মানদণ্ডের মতো ছিল না। বিতর্কটি নতুন করে ফিরে আসে ২০২৫ সালে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালে দুদক মামলাটি পুনঃতদন্ত শুরু করে। তখন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে।
তার অভিযোগ ছিল, আগের কমিশন পর্যাপ্ত উপাদান থাকার পরও মামলাটি ‘জোর করে’ নিষ্পত্তি করেছিল। মূল্যায়ন কমিটি পরিবর্তন, একই উপকরণ বা সেবা একাধিকবার কেনা দেখানো এবং জীবনবৃত্তান্ত মূল্যায়নে অসঙ্গতিসহ কয়েকটি দিক সামনে আনা হয়। সেখান থেকে পুরোনো প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়।
২০২৫ সালে যে আলামত পাওয়া গেল, ২০১৪ সালে তা কেন দেখা হয়নি? বিশ্বব্যাংকের প্যানেলের আপত্তি কেন গুরুত্ব পায়নি? আবুল হোসেনকে কেন এজাহারের বাইরে রাখা হয়েছিল? সাহাবুদ্দিন একা মামলা করেননি। একা বন্ধও করেননি। সিদ্ধান্ত ছিল কমিশনের। কিন্তু তদন্ত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার এবং সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য রক্ষক হিসেবে দায়ের প্রশ্ন থেকে তিনি বের হতে পারেননি।
সাহাবুদ্দিনের সমালোচকরা তাঁকে ক্ষমতাসীনদের রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুদক কমিশনার থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে ঘুষ গ্রহণের কথা বলা হলেও এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অভিযোগটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক। সেটা হচ্ছে দুদকের নিরপেক্ষতা নষ্ট করা। অনুসন্ধানের পরিধি সীমিত রাখা। ক্ষমতাসীনদের বিষয়ে নমনীয় থাকা। বিরোধীদের বিষয়ে রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা।
২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রার্থীর সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার তথ্য হলফনামায় প্রকাশিত হয়। তখন সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলে নির্বাচন ব্যাহত হতে পারে। পরে সমালোচনার মুখে দুদক সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে (টিআইবি) নিয়ে সাহাবুদ্দিনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তখন অনেক সমালোচক বলেছেন, তার ভাষা দুদক কমিশনারের চেয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো শোনায়। পাবনায় শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনের অর্থায়নেও মো. সাহাবুদ্দিনের নাম এসেছিল। সাহাবুদ্দিন অবশ্য পরে দাবি করেছিলেন, তার অনুমতি ছাড়াই নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।
দুদকের মেয়াদ শেষে মো. সাহাবুদ্দিন বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে যান। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হন। পরে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। একই সময়ে তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টাও ছিলেন। এটি ছিল ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে।
পরবর্তী অনুসন্ধানে ব্যাংক দখল, প্রক্সি শেয়ারধারী, অস্বচ্ছ ঋণ এবং বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন সেই সময়ের পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। এত বড় অনিয়মের অভিযোগের সময় ভাইস চেয়ারম্যান কি জানতেন? পর্ষদ কি অনুমোদন করেছে? তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন কিনা? এসব প্রশ্নের জবাব কখনও পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দিন তিনি ব্যাংকের পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সাহাবুদ্দিনের সালাম করার একটি পুরোনো ছবি রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়নের পর নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে সালাম করা অপরাধ নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরপেক্ষ অভিভাবকের এমন দৃশ্য ভিন্ন বার্তা দেয়। সমালোচকেরা ছবিটিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনগত বৈধতাও আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছিল। যারা আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন তাদের প্রশ্ন ছিল, সাবেক দুদক কমিশনার রাষ্ট্রপতি হতে পারেন কিনা। যদিও হাইকোর্ট সেই রিট খারিজ করে দিয়েছিলেন। তখন আদালত বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদ প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ নয়। আপিল বিভাগও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এরপর তার রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আইনগত বাধা কেটে যায়। তবে রাজনৈতিক প্রশ্নটি থেকেই যায়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় তার নীরবতা নিয়েও অনেক অভিযোগ রয়েছে— আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতাদের। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের সর্বোচ্চ অবশিষ্ট সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ। তিনি সংসদ ভেঙে দেন। খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তে অংশ নেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ান— যা তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হিসেবে বঙ্গভবনে যাওয়া মানুষটিকেই নিয়তি হিসেবে শেখ হাসিনা-পরবর্তী ব্যবস্থার পথ খুলে দিতে হয়েছে। কিন্তু সংকট শেষ হয়নি।
৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। পরে মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপে বলেছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। কিন্তু তার কাছে কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। তিনি পদত্যাগপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেও পাননি। ফলে তার দুটি বক্তব্য একরকম ছিল না।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মিথ্যা বলা ও শপথ ভঙ্গের অভিযোগে সাহাবুদ্দিনকে অভিযুক্ত করেন। ছাত্রদের একাংশ তার পদত্যাগ দাবি করেন। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়। কেউ কেউ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তা বাহিনী বলপ্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে বিএনপিসহ কয়েকটি দল বলেছিল, রাষ্ট্রপতিকে সরালে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে। যে কারণে তিনি তখন টিকে যান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল খুবই শীতল। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা দীর্ঘদিন তার সঙ্গে দেখা করেননি। তার প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে তার ছবি নামানো হয়েছে। তিনি নিজেকে অপমানিত মনে করেছেন। তার ভাষায়, তার কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছিল। নির্বাচন শেষ হলে সরে যেতে চান বলেও জানিয়েছিলেন।
বিদায়ের ঠিক আগে আবারও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি। পদত্যাগের প্রশ্নকে বলেছেন, ‘বিব্রতকর প্রশ্ন’। শেখ হাসিনার সঙ্গে কথিত ফোনালাপের খবরকে তিনবার ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। দাবি করেন, তিনি সারাজীবন ন্যায্যভাবে কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকালে পদত্যাগ করলেন। মেয়াদ পূর্ণ হলো না।
সাহাবুদ্দিনের উত্থান ছিল রাজনৈতিক আস্থা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সমন্বয়। পতনের কারণও সেই রাজনৈতিক আস্থার ছায়া। পদ্মা সেতুর তদন্তে মন্ত্রীর নাম বাদ দেওয়া, দুদকের দলীয় ভাষা, এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য, শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য এবং পদত্যাগপত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। সবকিছু মিলে তার রাষ্ট্রপতিত্ব এক জটিল অধ্যায়। তার বিদায় শুধু একজন রাষ্ট্রপতির অসমাপ্ত মেয়াদের সমাপ্তি নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে রাজনৈতিক আনুগত্যের মূল্য কতটা নির্মম ও দীর্ঘ মেয়াদি হতে পারে, তারও একটি উদাহরণ।
তবে পদত্যাগেই বিতর্কের অবসান হচ্ছে না। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, পদত্যাগের পর মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) জামালপুরে এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, শুধু পদত্যাগ যথেষ্ট নয়। সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, শপথ ভঙ্গ এবং জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর তদন্ত ও বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে একজন সৎ, নিরপেক্ষ ও অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিকে নতুন রাষ্ট্রপতি করার দাবি জানান তিনি।
অপরদিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার।
সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। চুপ্পুর পদত্যাগের সম্ভাবনার কারণে থাইল্যান্ডে সফর সংক্ষিপ্ত করে দুই দিন আগে আজ শুক্রবার দেশে ফিরেছেন সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি চিকিৎসার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন।
এছাড়াও বিদায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন দেশে সাংবিধানিক বিপর্যয় হতে দিইনি। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রে নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকার কারণেই দেশে কোনও সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি। শুক্রবার (২৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পাঠানো আনুষ্ঠানিক চিঠিতে তিনি পদত্যাগের কারণ, দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
চিঠিতে তিনি বলেন, ‘‘তৎকালীন সরকারের পতনের পর সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। পরে সেই পরামর্শ অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’’ রাষ্ট্রপতির ভাষ্য, নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং সরকারি ও বিরোধী দল সংসদে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রেখেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর ইতিবাচক ভূমিকা দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে।