, , ।
সবুজ ইসলাম: একসময় উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকদের অনেকেই বাধ্য হয়ে সেই পণ্য ফেলে দিতেন, কিংবা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতেন। বাজারে চাহিদা কমে গেলে কিংবা সরবরাহ বেড়ে দাম পড়ে গেলে মাথায় হাত পড়ত চাষিদের। তবে রাজশাহীতে কৃষকদের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে ‘ফার্মারস মিনি কোল্ড স্টোরেজ’। আধুনিক, সাশ্রয়ী ও সৌরচালিত এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দীর্ঘদিন ভালো রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। এতে যেমন অপচয় কমছে, তেমনি বাজার সুবিধাজনক হলে ভালো দামে বিক্রি করে বাড়ছে কৃষকের আয়।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ। নিজের জমিতে তিনি বিটরুট, পুদিনা পাতা, লেটুস, আইস লেটুস, থাই পাতা, চেরি টমেটো, রেড ক্যাবেজ, ক্যাপসিকাম ও ব্ল্যাঞ্চিং অনিয়নসহ নানা ধরনের বিদেশি জাতের সবজি চাষ করেন। বর্তমানে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে তিনি বিটরুট আবাদ করেছেন। তিনি জানান, এসব সবজির বাজারে কখনো চাহিদা থাকে, আবার কখনো হঠাৎ কমে যায়। আগে তখন কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন কিংবা লোকসান গুনতে হতো। কিন্তু এখন সরকারিভাবে পাওয়া মিনি কোল্ড স্টোরেজে পণ্য সংরক্ষণ করে তিনি বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রি করতে পারছেন।
জাহাঙ্গীর বলেন, “একটা সময় সবজির দাম না পেলে ফেলে দিতে হতো, কখনো গরু-ছাগলকে খাওয়াতাম। এখন সেই অবস্থা নেই। বাজারে দাম কম থাকলে আমি পণ্য কোল্ড স্টোরেজে রেখে দিচ্ছি। যখন দাম বাড়ছে, তখন বিক্রি করছি। এতে লাভও হচ্ছে, পণ্যও নষ্ট হচ্ছে না।”
তিনি জানান মিনি কোল্ড স্টোরে খরচ কম, সুবিধা বেশি। ১০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মিনি কোল্ড স্টোরেজটিতে জাহাঙ্গীর প্রায় সাড়ে ৯ টন সবজি সংরক্ষণ করেছেন। ক্ষেত থেকে তোলা বিটরুট, বাঁধাকপি ও অন্যান্য সবজি সেখানে সযত্নে রাখা হয়েছে।
মিনি কোল্ড স্টোরের সুবধিা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাইরের কোল্ড স্টোরেজে জায়গা পাওয়া কঠিন, আবার খরচও অনেক বেশি। সেখানে ১০ টন পণ্য রাখতে মাসে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই মিনি কোল্ড স্টোরেজে মাসে বিদ্যুৎ বিল আসে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুতে চলে বলে খরচ আরও কম। কম খরচে নিজের ইচ্ছেমতো পণ্য রাখা ও বের করা যায় এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা।”
শুধু তিনি নিজে না, আশপাশের কৃষকরাও পাচ্ছেন সুবিধা মিনি কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা। শুধু একজন কৃষক নয়, আশপাশের চাষিরাও প্রয়োজন অনুযায়ী এই মিনি কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহার করতে পারছেন। পণ্যের পরিমাণ অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে তারা সংরক্ষণের সুবিধা নিচ্ছেন।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “বাইরের স্টোরেজে অনেক ঝামেলা, খরচও বেশি। এখন গ্রামের কাছেই আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা পাওয়ায় আমরা উপকৃত হচ্ছি। প্রয়োজন হলে পণ্য রেখে পরে ভালো দামে বিক্রি করতে পারছি। এতে লোকসান কমছে।”
জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ বিতরণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজশাহীতে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি। এর মধ্যে দুটি গোদাগাড়ী উপজেলায় এবং দুটি পবা উপজেলায়। পবার নওহাটার থালতা গ্রামের ইউনিটটির কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অন্যগুলো নির্মাণ ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই মিনি কোল্ড স্টোরেজ দুটি মডেলে তৈরি করা হয়েছে। একটি ঘরভিত্তিক এবং অন্যটি কনটেইনারভিত্তিক। দুটিই সৌরচালিত, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমনকি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও এটি পরিচালনা সম্ভব। ঘরভিত্তিক ১০ টন ধারণক্ষমতার ইউনিট নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৫ লাখ টাকা। আর কনটেইনারভিত্তিক ইউনিটের খরচ প্রায় ১৫ লাখ টাকা। প্রচলিত কোল্ড স্টোরেজের তুলনায় এতে ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।
আরো জানা যায়, এই মিনি কোল্ড স্টোরেজে ৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৮৫-৯৫ শতাংশ আর্দ্রতায় বিভিন্ন সবজি ও ফলমূল তুলনামূলক দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। টমেটো (পাকা), বেগুন, শসা, করলা: প্রায় ৭-১০ দিন ভালো থাকবে। পাশাপাশি কাঁচামরিচ: ১০-১৫ দিন, ঢেঁড়স: ৫-৭ দিন ক্যাপসিকাম, মুলা, শালগম, ফুলকপি: ২-৩ সপ্তাহ, গাজর, বিটরুট, বাঁধাকপি: ৩-৪ সপ্তাহ, ব্রকলি, বরবটি, মটরশুঁটি, লাউ, পেঁপে: ১-২ সপ্তাহ, আদা, হলুদ, কুমড়া, শসা (দীর্ঘমেয়াদি): ৬-৮ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায় (প্রয়োজন অনুযায়ী ১২-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়)।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষকের বাঁচার নতুন উদ্যোগ ‘মিনি কোল্ড স্টোরেজ। জেলার পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মান্নান বলেন,“ফার্মারস মিনি কোল্ড স্টোরেজের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। আগে দাম কমে গেলে কৃষক বাধ্য হয়ে পণ্য কম দামে বিক্রি করতেন বা ফেলে দিতেন। এখন তারা সংরক্ষণ করে সময়মতো বিক্রি করতে পারছেন। এতে কৃষকের ক্ষতি কমছে এবং আয় বাড়ছে।”
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, “এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, কৃষকের বাঁচার হাতিয়ার। কম খরচে, সহজ ব্যবহারে এবং সৌরশক্তিচালিত হওয়ায় এটি কৃষকের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে এই উদ্যোগ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।”