, , ।
মুন্না হোসাইন, তাড়াশ: শষ্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সোনালি পাকা ধানের সমারোহ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কৃষকের ঘামঝরা সেই সোনালী স্বপ্ন ঘরে তোলার মহোৎসব শুরু হয়েছে। তাই তো এখন কৃষকের হাসি আর ব্যস্ততায় মুখরিত পুরো এলাকা।
রাতের আধার পেরিয়ে ভোর হলেই কৃষকেরা দলবদ্ধ হয়ে পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত হয়ে পরে। সূর্য গড়িয়ে পশ্চিম আকাশে অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত চলে ধান কাটা, বহন ও মারাইয়ের কাজ। শ্রমিকদের সারিবদ্ধ হয়ে ধান কাটার এমনই দৃশ্য দেখা মিলে চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশে। বোরো ধান কাটা উৎসবের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে মৌসুমের প্রধান ফসল ঘরে তোলার আনুষ্ঠানিকতা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠ জুড়ে ব্রিধান-২৯, ব্রিধান-৫৮, ব্রিধান-৭৪, ব্রিধান-৮৯সহ উন্নত জাতের ধানের আবাদ হয়েছে। হাতে কাস্তে মাথায় গামছা বেধে গুন গুন গান গাওয়ার ছলে এবং মুখে উলু ধ্বনি দিয়ে ধান কাটছে কৃষকরা। প্রখর রোদে ধান কাটার মাঝেও তাদের মধ্যে দেখা যায় আনন্দের উৎসব। দিন শেষে মাথায় ধানের বোঝা নিয়ে লম্বা লাইনে বাড়ি ফিরে কৃষকরা। কেন না তাদের স্বপ্নের সোনালি ধান যাচ্ছে বাড়ি।
চলনবিলের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকার আক্রমণ কম হওয়ায় এবছর ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ধানের ফলন ভালো হলেও বাজার দর কম হওয়ায় কিছুটা হতাশায় রয়েছে কৃষকরা। তারা যেন ধানের ন্যায্যমূল্য পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন কৃষকরা।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তাড়াশ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২২ হাজার ৫ শত ১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন।
নিজের জমির ধান কাটা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কৃষক মোতাহার হোসেন। তবে আনন্দের পাশাপাশি মনের কোণে কিছুটা শঙ্কাও প্রকাশ করে বলেন, এই ধান শুধু আমাদের ফসল না, এটা আমাদের স্বপ্ন। দিন-রাত এক করে রক্ত পানি করে জমিতে পড়ে থাকতাম। আজ যখন চোখের সামনে সোনালী ধান ঘরে উঠছে, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে। তবে আমাদের একটাই চাওয়া সরকার যেন ধানের সঠিক দাম নিশ্চিত করে। চড়া দামে সার-কীটনাশক কিনে আবাদ করেছি, এখন যদি ন্যায্য দামটা পাই তবেই পরিবারের মুখে হাসি ফুটে থাকবে।
কৃষক কাদের মিয়া জানান, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের এই মৌসুমটি তাদের বছরের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত সময়। হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন মাঠের সোনালি ফসল ঘরে ওঠে, তখন তাদের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বিশেষ করে চলনবিলের মতো নিচু এলাকায় বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকলেও, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তারা বাম্পার ফলনের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।
কৃষক জাহিদ, মালেক ও কবির হোসেন বলেন, গত বছর বিঘাতে ২২-২৪ মণ হারে ধানের ফলন হয়েছিল। পোকা মাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় এবং সময়মতো ভর্তুকি মূল্যে সার ও বীজ পাওয়ায় এ বছর ফলন ২৫-৩০ মণ হারে হয়েছে। তবে গত বছরের চেয়ে এবার জমি লিজের মূল্য বেছে বিঘাপ্রতি ৩-৫ হাজার টাকা ও শ্রমিকের মূল্য বেড়েছে ১০০-১৫০ টাকা। গড়ে বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, এ বছর পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় এবং সময়মতো কৃষকরা ভর্তুকি মূল্যে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ পাওয়ায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি অফিসের মাধ্যমে নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাড়াশে ১ শতাংশ জমিতে ধান কাটা শুরু হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে কয়েকদিনের মধ্যে সব ধান কাটা হয়ে যাবে এবং আশা করছি কৃষক এবার ভালো লাভবান হবে।
তিনি আরও জানান, এবছর প্রতি হেক্টর জমিতে ৬ থেকে ৭ মেট্রিক টন ধান এবং ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তপ্ত রোদে ধান কাটার শব্দ আর কৃষকের উচ্ছ্বাসে আজ যেন এক অন্যরকম উৎসবে মেতেছে চলনবিলের বুক। কৃষকের আশা, শেষ পর্যন্ত ঘরে উঠবে তাদের কষ্টের ফসল।