বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
ঈশ্বরদী প্রতিনিধি: ঈশ্বরদীতে দাদি ও নাতনিকে পাশবিক হত্যাকান্ডের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পাবনা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডে শরিফুল ইসলাম শরীফ (৩৫) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সম্পর্কে নিহত কিশোরীর প্রতিবেশী চাচা এবং পেশায় ট্রাক চালক।
শরীফ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন, শ্লীলতাহানির চেষ্টা এবং তাতে নাতনির বাঁধার কারণে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই তিনি জয়নাল খাঁর মা সুফিয়া খাতুন (৬৫) এবং তার নাতনি জামিলা আক্তার (১৫) কে খুন করেন।
গ্রেপ্তারকৃত শরীফ ও নিহতরা ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। নিহত জামিলা আক্তার কালিকাপুর দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনায় জামিলার বোন বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্র জানায়, জামিলার বাবা জয়নাল খাঁ কাজের তাগিদে প্রায়ই ঢাকার সাভারে তার বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। জামিলা তার দাদি সুফিয়া খাতুনের সঙ্গেই গ্রামের বাড়িতে বসবাস করতেন। ঘটনার সময়ও জামিলার বাবা বাড়িতে ছিলেন না।
পাবনা ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ট্রাকচালক শরিফুল ইসলাম শরীফ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। শরীফ দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে।
শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি জামিলাদের বাড়িতে বাজার পৌঁছে দিতে যান। সে সময় সুফিয়া খাতুন বাড়িতে না থাকার সুযোগে শরীফ জামিলার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। কিশোরী জামিলা এতে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন এবং শরীফকে চড় মারেন। এই ঘটনা শরীফ চরম অপমানিত হয়ে ফিরে আসেন। এর কয়েকদিন পর, গত শুক্রবার ২৭ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে শরীফ আবারও জামিলাদের বাড়িতে যান। এবার তিনি দাদি সুফিয়া খাতুন ও নাতনি জামিলার কাছে পূর্বের ঘটনার জন্য ক্ষমা চান।
তবে সুফিয়া খাতুন তাকে ক্ষমা না করে উল্টো জোরে জোরে চিৎকার শুরু করতে শুরু করেন। এতে শরীফ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। একপর্যায়ে শরীফ পাশে পড়ে থাকা একটি কাঠের বাটাম দিয়ে সুফিয়া খাতুনের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। বৃদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে জামিলা চিৎকার করতে শুরু করে। এতে শরীফ তাকেও কুন্নি (রাজমস্ত্রিদের প্লাস্টার করার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম) ও হাতুরি দিয়ে জামিলার মাথায় ও কপালে উপর্যপুরি আঘাত করেন।
জামিলা মাটিতে পড়ে গেলে শরীফ তাকে টেনে হিঁচড়ে বাড়ির পাশের একটি খোলা সরিষা ক্ষেতে নিয়ে যান।
শরীফ আরও জানায়, পুকুরপাড় দিয়ে টেনে নেওয়ার সময় জামিলা বিবস্ত্র হয়ে যায় এবং ওই অবস্থাতেই তিনি জামিলাকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের পর শরীফ গলা টিপে জামিলার মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ সরিষাক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যান।
গত শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে স্থানীয়রা বাড়ির উঠানে সুফিয়া খাতুনের রক্তাক্ত মরদেহ এবং পরে সরিষা ক্ষেতে জামিলার বিবস্ত্র মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। ঈশ্বরদী থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
ঘটনার পরে প্রাথমিকভাবে ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মমিনুজ্জামান এবং ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পাবনা ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল তদন্ত শুরু করে। তারা স্থানীয় তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজন হিসেবে শরিফুল ইসলাম শরীফকে শনিবার রাত ১০টার দিকে আটক করে। ডিবি কার্যালয়ে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শরীফ নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন বলে নিশ্চিত করেছেন পাবনা জেলা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলাম।
গতকাল রোববার সকালে অভিযুক্ত শরিফুল ইসলাম শরীফকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আইন-শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অভিযানের নেতৃত্ব দেন ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার। সেখানে পুলিশ, র্যাব ও ডিবির সদস্যরা অংশ নেয়। অভিযুক্ত শরীফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত হাতুড়ি উদ্ধার করা হয় পার্শ্ববর্তী একটি পুকুর থেকে। এছাড়াও হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সকল আলামত জব্দ করে পুলিশ। স্থানীয় এলাকাবাসী ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকান্ডের জন্য পাষন্ড শরিফুল ইসলাম শরীফের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
অপর দিকে ময়না তদন্ত শেষে গতকাল রোববার বাদ আসর নিহত দাদী সুফিয়া খাতুন ও কিশোরী জামিলা আক্তার এর জানাযা শেষে দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়েছে। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।