বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সানশাইন ডেস্ক: যাদের কাছে মানুষের ‘মূল্যায়ন নেই’, তাদের কাছে দেশ কখনো ‘নিরাপদ হতে পারে না’ বলে সতর্ক করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “আজকে বাংলাদেশের তাবৎ মা বোনদেরকে বলব আমি, যারা আপনাদেরকে এভাবে অপমানিত করে, তাদেরকে আপনারা কীভাবে জবাব দেবেন, আজ সেই সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে।” জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ‘নারী বিদ্বেষী’ পোস্ট ঘিরে উত্তাপের মধ্যে সোমবার দুপুরে খুলনার খালিশপুরের প্রভাতী স্কুল মাঠে এক নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যানের এ বক্তব্য আসে।
তারেক রহমান বলেন, “যে দলটি নির্বাচনের আগে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অসম্মানজনকভাবে কথা বলে, তাহলে আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আজকে নির্বাচনে যদি তারা কোনোভাবে সুযোগ পায়, নির্বাচন পরবর্তী সময় তাহলে তাদের আচরণ কী হতে পারে? “এরা শুধু নিজের স্বার্থের কথা বোঝে। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। যেখানে প্রয়োজন সেখানে তারা তাদের মতন করে ধর্মকে ব্যবহার করে।” শনিবার বিকালে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ওই পোস্টে বলা হয়, “নারীর প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা অনুশোচনামূলক নয়- এটা নীতিগত। আমরা মনে করি না- নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটা অনুমোদন করেন না।
“আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়, তখন এটি অন্য কিছু নয় বরং অন্য রূপে পতিতাবৃত্তির মতই “ওই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। প্রায় নয় ঘণ্টা পর জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের দলীয় প্রধানের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক করে’ ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তারা আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।
জামায়াতের ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে খুলনার জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “এই বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ, তারা পরিষ্কারভাবে বলেছে যে আইডি এভাবে হ্যাক হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দলের একজন সিনিয়র নেতা জনগণের সামনে নির্বাচনের আগে এভাবে মিথ্যা কথা বলছে, দলটি পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলছে তাদের আইডি বলে হ্যাক হয়ে গিয়েছিল, অথচ আইডি হ্যাক হয়নি তাদের। “এরা নির্বাচনের আগে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের সামনে মিথ্যা কথা তুলে ধরছে, মিথ্যা কথা বলছে। এদের একটাই পরিচয় এরা মিথ্যাবাদী।”
জামায়াতের অবস্থানের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, “একটি রাজনৈতিক দল এই যে বাংলাদেশের অর্ধেক গোষ্ঠী নারী, কীভাবে তাদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায় সেই কথা তারা বলেছে। আমরা দেখেছি একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে যে তারা কোনভাবেই নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না।
“আমরা দেখেছি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিষ্কারভাবে দুদিন আগে বলেছে যে যেসকল মহিলা যেসকল মা বোনেরা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে, কর্মসংস্থানের জন্য যান, তাদেরকে–প্রিয় ভাইবোনেরা, আপনাদের সামনে আমার বলতে রীতিমতো লজ্জা হচ্ছে–এমন একটি শব্দ সে আমাদের মা বোনদের জন্য ব্যবহার করেছে, যা এই দেশের জন্য একটি কলঙ্ক স্বরূপ।”
বিএনপি নেতা বলেন, “এই বাংলাদেশে খেটে খাওয়া মানুষের পরিবারের অধিকাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে সংসারের উপার্জনের জন্য কাজ করে থাকে। এই বাংলাদেশের ৫০ লক্ষের ও উপরে নারীৃ আজ যে গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে সকলে গৌরব করে, সেই গার্মেন্টস শিল্পে নারী শ্রমিকরা কাজ করেন।
“কিন্তু আজ আমরা দেখেছি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নারীদেরকে কীভাবে অসম্মানিত করেছে, তাদেরকে খারাপ ভাষা দিয়ে অসম্মানিত করেছে।” মুসলমানদের মহানবীর (সা.) স্ত্রী বিবি খাদিজাও যে একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন, তিনি যে ব্যবসায়ী ছিলেন, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “তাহলে আজকে কোথায় গিয়ে দাঁড়াল বাংলাদেশের নারী সমাজ? তাবৎ পৃথিবীর নারী সমাজকে কিভাবে অপমান করা হল! ”
সেই দলটি (জামায়াতে ইসলামী) নির্বাচনের আগে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ‘ঘরের মধ্যে বন্দি করতে চায়’ মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা যেহেতু বিশ্বাস করি, অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনোভাবেই দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব নয় সেজন্যই আমরা বলেছি ইনশাআল্লাহ আপনাদের দয়ায় আল্লাহর রহমতে বিএনপি সরকার গঠন করলে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গৃহিণীর কাছে প্রত্যেকটি মায়ের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব। “যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আমরা দেশের নারী সমাজকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। যাতে করে এই নারী সমাজ কারো প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে না হয়; যাতে করে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।”
জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আপনারাও তো ঘর থেকে বের হয়ে দলের কাজে যাচ্ছেন। ঘর থেকে বের হয়ে যে নারী কাজে যায়, তাকে আপনাদের নেতা কীসের সাথে তুলনা করেছে? চিন্তা করে দেখুন। “তাহলে আমাদের প্রশ্ন ওই দলের যারা নারী সদস্য আছে তাহলে তাদের প্রকৃতি পরিচয় কী? তাদের নেতার বক্তব্য অনুযায়ী তাহলে তাদের প্রকৃতি পরিচয় কী?
তারেক রহমান বলেন, “যে দলের নেতা নিজের দলের নারী কর্মীদেরকে এভাবে অপদস্ত অপমানিত করতে পারে, সেই দলের নেতা যদি সুযোগ পায়, তাহলে বাংলাদেশের সাধারণ নারীদেরকে, সাধারণ মা বোনদেরকে তারা কীভাবে অপদস্ত অপমানিত করবে, তার উদাহরণ আমরা ১৯৭১ সালেই দেখেছিলাম। “এই দেশের লক্ষ লক্ষ মা বোনদেরকে অসম্মানিত করেছিল এই দলটির পূর্বসূরি নেতৃবৃন্দ। কাজেই যাদের কাছে মানুষের কোনো মূল্যায়ন নেই যাদের কাছে মানুষের কোনো আত্মসম্মান বোধ নেই, তাদের কাছে কখনো দেশ নিরাপদ হতে পারে না, তাদের কাছে কখনো দেশের মানুষ নিরাপদ হতে পারে না নারী পুরুষ নির্বিশেষে।”
দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনায় এসে এই নির্বাচনি জনসভায় যোগ দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি মঞ্চে উঠলে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। তারেক রহমান তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে হাত নেড়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ধানের শীষের ১৪টি আসনের প্রার্থীরা এই জনসভা মঞ্চে ছিলেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন-আমীর এজাজ খান (খুলনা-১), নজরুল ইসলাম মঞ্জু (খুলনা-২), রকিবুল ইসলাম (খুলনা-৩), এস কে আজিজুল বারী (খুলনা-৪), মোহাম্মদ আলি আসগার (খুলনা-৫), এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী (খুলনা-৬); হাবিবুল ইসলাম হাবিব (সাতক্ষীরা-১), আব্দুর রউফ (সাতক্ষীরা-২), কাজী আলাউদ্দীন (সাতক্ষীরা-৩), মনিরুজ্জামান (সাতক্ষীরা-৪); কপিল কৃষ্ণ মন্ডল (বাগেরহাট-১), শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন (বাগেরহাট-২), শেখ ফরিদুল ইসলাম (বাগেরহাট-৩) ও সোম নাথ দে (বাগেরহাট-৪)।
তারেক রহমান বলেন, “এই বিশাল অঞ্চলে আজ বহু সমস্যা আছে। যেমন এই খুলনা ছিল এক সময় শিল্প নগরী, কিন্তু আমরা দেখছি গ্যাসসহ বিভিন্ন কারণে আজ এই শিল্প নগরী প্রায় মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ বিএনপি আগামী ১৩ তারিখে সরকার গঠন করলে, এই শিল্প নগরীকে আবার জীবিত শিল্প নগরীতে আমরা পরিণত করতে চাই।
“শুধু পুরুষরাই নয়, সেইসব শিল্পের মধ্যে যাতে নারীদেরও কর্মসংস্থান হয়, সেভাবে আমরা এই অঞ্চলের শিল্প নগরীকে গড়ে তুলতে চাই।” বিএনপি নির্বাচিত হলে খুলনায় আইটি পার্ক গড়ে তোলারও প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। যে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ আছে, সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দেন। খুলনা অঞ্চলের ভোটারদের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আসুন আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করে দেশ পূনর্গঠনের কাজে আমরা হাত দিই। আমার দুই পাশে ধানের শীষ হাতে যাদের প্রার্থী করেছি তাদের আপনারা কম বেশি চেনেন। এই মানুষগুলোকে ১২ তারিখ পর্যন্ত দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের।
“ইনশাল্লাহ ১২ তারিখে ধানের শীষের সরকার গঠিত হলে ১৩ তারিখ থেকে এই মানুষগুলো আপনার এলাকার উন্নয়ন, সমস্যা-অসুবিধা সব কিছু দায়দায়িত্ব তাদের। আপনাদের কাছে এই মানুষগুলোর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে গেলামৃইনশাল্লাহ।” তিনি বলেন, “আজকে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, আমরা যে কোনো মূল্যে ধানের শীষকে বিজয়ী করব, ধানের শীষকে বিজয়ী করার মাধ্যমে আমরা দেশ পুনর্গঠনের হাত দেব।”
ভোটারদের সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, বলেন, “আমরা খেয়াল করছি একটি মহল বলার চেষ্টা করছে এবার ভোট গণনাতে বলে অনেক সময় লাগবে। শুনেছেন এই কথা আপনারা? ষড়যন্ত্র কিন্তু আবার শুরু করেছে। “এই যে যাদের কথা বলেছি প্রথমে, যারা জনগণের সামনে সকাল বিকাল মিথ্যে কথা বলছে, যারা দেশের নারী সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করছে, এরাই আবার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে বিভিন্নভাবে, কারণ তারা জানে, তাদের এইসব কথাবার্তা তাদের এইসব কাজকর্ম এইসব ফাঁকিবাজি মানুষ ধরে ফেলেছে এবং সেই জন্যই তারা বিভিন্ন ছলচাতুরীর চেষ্টা করছে।”
বিএনপি নেতা বলেন, “এই জনসভায় দাঁড়িয়ে আপনাদের সকলকে বলতে চাই, আপনাদেরকে আজ থেকে সতর্ক থাকতে হবে, সজাগ থাকতে হবে। যে অধিকার আপনি গত এক যুগ ধরে পাননি, আবার যাতে এই অধিকার কেউ কেড়ে নিয়ে যেতে না পারে আপনাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে, দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সকলকে সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে।”
খুলনার জনসভা শেষে খুলনা থেকে হেলিকপ্টারে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। সেখানে নতুন উপশহরে বিরামপুর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনি জনসভায় তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানকার জনসভা শেষে বিএনপি নেতা হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় ফিরবেন।