সর্বশেষ সংবাদ :

আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি কান্না থামাতে শিশু নাঈমকে মারধোর করেছিলেন সৎ মা

আক্কেলপুর প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে সাড়ে চার বছরের শিশু নাঈম হত্যাকান্ডের ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তার সৎ মা জাহানারা বেগম। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত রোববার দুপুরে উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের গিলাকুড়ি গ্রামে এ নির্মম ঘটনা ঘটে।
ওইদিন পুলিশ অভিযুক্ত সৎ মা জাহানারা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। পরে সোমবার বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করলে জবানবন্দিতে তিনি স্বীকার করে করেন। নাঈম অতিরিক্তি কান্নাকাটি ও দুষ্টুমি করায় রাগের মাথায় তিনি নিজে অতিরিক্ত মারপিট করেন। এ কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে আদালতকে জানান তিনি।
যেভাবে হত্যা করা হয় নাঈমকে: জবানবন্দিতে জাহানারা জানান, নাঈম কয়েকদিন ধরে শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিল। একারণে সে সবসময় বাসায় কান্নাকাটি করতো। এতে তিনি বিরক্তবোধ করতেন। রোববার সকাল সাড়ে দশটার দিকে ঘরে তার বোন জান্নাতুনের সঙ্গে সে খেলাধুলা করছিল। খেলাধুলার একপর্যায়ে তারা দুষ্টুমি করার সময় আবারও সে অতিরিক্ত কান্না করছিল। এতে সে অতিষ্ট হয়ে নিজের মেজাজ হারিয়ে ফেলেন।
একপর্যায়ে রাগের মাথায় তাকে মারপিট করতে থাকেন। মারধর বেশি হয়ে যাওয়াই একপর্যায়ে সে ঘরের মেঝেতে পড়ে যায়। এসময় কোলে থাকা নিজের শিশু সাইমও কান্না করতে থাকে।
নাঈমকে মেঝেতে ফেলে রেখে তার নিজের শিশুকে খাওয়াইয়ে ঘুমিয়ে দিতে অন্য কক্ষে চলে যান। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে নাঈমকে বাথরুমের মধ্যে সজ্ঞাহীন অবস্থায় পান। পরে বুঝতে পারেন সে মারা গেছে।
জাহানারা আদালতকে বলেন, তাকে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলার জন্য মারধর করিনি। দুষ্টুমি আর অতিরিক্ত কান্নাকাটি করার কারণে মারধর করেছি। অতিরিক্ত মারধরের কারণেই সে মারা গেছে।
আদালতে নাঈমের সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী বোন জান্নাতুনও জবাবনবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে সে বলেছে, তার ভাই নাঈম খেলার সময় অনেক কান্না করতে থাকে। তার কান্না থামাতে সৎ মা জাহানারা তার ভাইয়ের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রচুর মারপিট করে। একপর্যায়ে পাশে থাকা বটি দিয়ে মাথায় আঘাত করে। এসময় মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বের হতে থাকে। তখন নাঈম মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে সজ্ঞাহীন অবস্থায় শরীরে পানি দেওয়ার জন্য বাথরুমে নিয়ে যায় তার সৎ মা। ততক্ষণে সে মারা গেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আরিফ হোসেন বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার দায় তিনি স্বীকার করেছেন। এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আদালত জবানবন্দি গ্রহনের পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্তের সব প্রক্রিয়া শেষ করে প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে প্রেরণ করা হবে।
বাবার তিন বিয়ে, নিঃসঙ্গভাবে সৎ মায়ের কাছে বড় হচ্ছিল শিশু নাঈম: পুলিশ, স্থানীয় লোকজন ও নিহত নাঈমের বাবা জলিল শেখের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাড়ে চার বয়সী শিশু নাঈম শেখ খুব শান্ত প্রকৃতির। নিজের মা মারা যাওয়ার পর সৎ মায়ের সংসারে বড় হচ্ছিল সে ও তার বোন জান্নাতুন। প্রথম থেকেই জাহানারা তার দুই সৎ সন্তানকে সহ্য করতে পারছিলেন না। বিভিন্ন সময় দুষ্টামির অজুহাতে ওই দুই শিশুকে শাসন করার নামে মারধর করতেন। তাদের বাবাও বিষয়টি সাধারণভাবে মায়ের শাসন মনে করতেন। এবিষয়ে তাদের কোন অভিযোগও ছিল না। কিন্তু সেই শাসনের পরিনতি ডেকে আনলো তার অকাল মৃত্যু।
জলিল শেখের প্রথম স্ত্রী নার্গিস বানু দুই কন্যা ও এক ছেলে সন্তান রেখে ২০১৪ সালে মারা যান। পরে ওই সালের শেষের দিকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে নাঈমের মা লিপি বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। লিপি বেগমও ২০২২ সালে দুই সন্তান নাঈম ও জান্নাতুন রেখে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি তিন বছর আগে আবারও তৃতীয় স্ত্রী জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন, যার কোলে এখন তের মাস বয়সী সাইম নামের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই জাহানারা তার সৎ দুই সন্তানকে সহ্য করতে পারছিলেন না। প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ প্রতিবেশীদের।
১১টার দিকে বদ্ধ ঘরে মারধর, পরে মৃত্যু: পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, রোববার বেলা ১১টার দিকে বাবার অনুপস্থিতিতে জাহানারা বেগম ছোট্ট নাঈমকে বেধরক মারধর করেন। এসময় নাঈম নিস্তেজ হয়ে পড়লে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদের ডেকে এনে তাদের সহায়তায় নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় নাঈমকে। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন। শিশুটির মাথায় গভীর ক্ষত ও শরীরজুড়ে মারধরের কালচে দাগ ছিল। দুপুরে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে এলাকার লোকজন প্রতিবেশীদের সহায়তায় শিশু নাঈমের মরদেহ বাড়ি থেকে বেড় করে পাশের জমিতে রেখে জাহানারাকে আটকে রাখেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সৎ মা জাহানারা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। পরে রোববার রাতে শিশুটির মামা এমদাদুল হক বাদি হয়ে আক্কেলপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহত নাঈমের বাবা আব্দুল জলিল শেখ বলেন, আমার ছেলে নাঈমকে মাঝে মধ্যে শাসন করতো। তবে তাকে ব্যাপক মারধর করতে কখনো দেখিনি। এমনকি সে তার মায়ের বিরুদ্ধে আমাকে কোন অভিযোগও দিতোনা। কিন্তু হঠাৎ সেদিন বাড়িতে আমার অনুপস্থিতে আমার স্ত্রী তাকে প্রচুর মারধর করেছে। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় নওগাঁ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার আমাকে জানায় সে মারা গেছে। আমার স্ত্রীই তাকে হত্যা করেছে।
মামলার বাদি শিশুটির মামা এমদাদুল হক বলেন, আমার বোন মারা যাওয়ার পর ভাগিনা নাঈম সৎ মায়ের সংসারে বড় হচ্ছিল। তার সৎ মা জাহানারা শাসন করার নামে কারণে অকারণে মারধর করতো। আমরা বিষয়টি স্বাভাবিক শাসনই মনে করতাম। অবশেষে তাকে পিটিয়ে এবং মাথায় ধারালো বটির কোপ দিয়ে হত্যা করেছে। তাকে এমনভাবে পিটিয়েছে সারা শরীরে কালচে দাগ পড়েছে। এই হত্যাকান্ডের বিচার চাই।
জয়পুরহাট জেলা পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা বলেন, শিশু নাঈম হত্যার ঘটনায় আক্কেলপুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মামলাটি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিবিরভাবে তদন্ত করছি। আশা করছি নাঈম হত্যার সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার নিশ্চিত হবে।


প্রকাশিত: December 3, 2025 | সময়: 1:37 am | সুমন শেখ

আরও খবর