, , ।
সবুজ ইসলাম: রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি ইউনিয়নের নওদাপাড়া এলাকার কৃষক রহিম আলী তার ২ বিঘা জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ শুরু করেছেন। শীত শুরুর আগে বাজারে সবজি সরবরাহ করতে পারলে ভালো মুনাফা এবং সবজির চাহিদা ভালো থাকে বলে জানান তিনি। তাই সবজি চাষে জমিতে পরির্চযা বাড়িয়েছেন। কিন্তু বাজারে সার ও বীজের দাম বেশি থাকায় তিনি পড়েছেন বিপাকে।
কৃষক রহিম আলী বলেন, ‘গতবার ফুলকপির বীজ কিনেছিলাম ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায়। এইবার সেই একই বীজ কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। আবার গতবার ১ হাজার ২০০ টাকা দামের সার এইবছর কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। এত দামে সার ও বীজ কিনতে আমাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। যা আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর।’
রাজশাহী ও এর আশেপাশের অঞ্চলে শুরু হয়েছে শীতকালীন আগাম সবজি চাষ। কিন্তু সার ও বীজ সংকটের কারণে কৃষক রহিম আলীর মত বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। খুচরা ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাড়িয়েছে সারের দাম, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বীজ ও কীটনাশকের মূল্যও। প্রশাসন বলছে বাজারে কোন সংকট নেই, অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু চাষিদের অভিযোগ বাড়তি দামেই বীজ ও সার কিনে চাষাবাদ করতে হচ্ছে তাদের। ফলে চড়ামূল্যে সার ও বীজ কিনে সবজির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা।
জেলার দূর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি এলাকায় চলছে সবজি চাষের ধুম। চাষিরা আগাম ফুলকপি বুনে লাভের আশা করলেও সার ও বীজের লাগামহীন মূল্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তাদের। কৃষকরা বলছেন, জমির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও অধিক মূল্য চাওয়া হচ্ছে।
এই এলাকার চাষি সুমন হোসেন বলেন, আমাদের এখানকার অনেক চাষি এনজিও থেকে ঋণ করে অথবা গরু বা ছাগল বিক্রি করে অনেক আশা নিয়ে আগাম সবজি চাষ করেন। কিন্তু সঠিক সময়ে সার না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাদের। সেই সাথে দ্বিগুণ মূল্যে বীজ ও সার কিনে খরচ ওঠাতে পারবেন কিনা সেই আশঙ্কায় দিন কাটে। এখন আমরা সরকারে দৃষ্টি আর্র্কষণ করছি যাতে সার বীজের দাম কমানো হয়।
পবা উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আগে যেখানে ২০ হাজার টাকা খরচে জমি তৈরি করে চাষ করতে পারতাম, এখন সেখানে ৩০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হচ্ছে। বাজারে যদি ন্যায্য দাম না পাই, তাহলে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকবে না।
তানোরের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ফুলকপির বীজ কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। উপরে সার আর সেচের খরচ যোগ হয়ে উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে।’
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলার কয়েকটি বাজারে গেলে সার ও বীজের দোকানদারের সাথে কথা বললে তারা বাড়তি দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তারা জানান নির্ধারিত দামেই সার ও বীজ বিক্রি হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার বলেন, ‘সারের দাম আমরা বেশি নিচ্ছি না। তবে সবাই তো আর এক না। কেউ কেউ কেজি প্রতি কয়েক টাকা বেশি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করার চেষ্টা করছি।’
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় রবি শস্য আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। তার ভিতরে জেলায় বেগুন চাষ হয়েছে ৮৬৮ হেক্টর, ফুলকপি ১৯৬ হেক্টর, বাধাকপি ১১৯ হেক্টর, শিম ২৫৪ হেক্টর এবং মূলা ২৪২ হেক্টর।
বাড়তি দামে সার ও বীজ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে জানিয়ে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, ‘‘রাজশাহীতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ শুরু হয়ে গেছে। কেউ যদি বাড়তি দামে বীজ ও সার বিক্রি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইননুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি তারা বীজের সার্বিক বিষয়ে দেখভাল করছে। বাজার নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে এছাড়াও বাড়তি দামে সার ও বীজ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট চলমান রয়েছে।”
তবে রাজশাহীর কৃষকেরা জানান, খরচের বোঝা না কমালে শীতকালীন সবজি চাষ টেকসই হবে না। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং এর প্রভাব পড়বে সারাদেশের সবজি বাজারেও।