, , ।
সবুজ ইসলাম : রাজশাহীতে সারের বাজার সিন্ডিকেটের কবল থেকে মুক্ত হতে পারছে না। যার ফলে বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। আর এতে কৃষকরা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের কাছে থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলাররা অবৈধভাবে সার মজুত করে দাম বাড়াচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে একাধিক লাইসেন্স নিয়ে সিন্ডিকেট পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। কিন্তু কৃষকরা দাবি করেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত যথেষ্ট নয়। সারের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সরেজমিনে জেলার কয়েকটি উপজেলায় গিয়ে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তা প্রতি ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়া হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামের মধ্যে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি এক হাজার ৫০ টাকা বিক্রি করার কথা রয়েছে কিন্তু বাস্তবে কৃষকদের ডিএপি কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। এক হাজার ৩৫০ টাকা টিএসপি বিক্রি করার কথা থাকলেও তা বিক্রি করা হচ্ছে এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায়। এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার ইউরিয়া বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকা দামে। এমওপি সারও বাজারে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি। আর এতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
গত জুলাই মাসে নায্য দামে সার না পেয়ে বিক্ষোভ করেছিল জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাটের কৃষকেরা। সমাবেশ থেকে একটি সারের ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানানো হয়। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার বেশি টাকা না দিলে সার দিচ্ছেন না।
শুধু গোদাগাড়ী উপজেলায় না, রাজশাহীর জেলার বাকি উপজেলায় সারের দামে ডিলারদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে কৃষকদের সাথে কথা বললে তারা জানান সারের বাড়তি দামের কথা। পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার বাগধানী এলাকার সাইদুল ইসলাম এইবার তার ৪ বিঘা জমিতে রোপা-আমণ চাষ করেছেন।
তিনি বলেন, আমি প্রতিবছরই এই বাগধানী বিলে চাষাবাদ করি। সারের বাজারের যে সিন্ডিকেট তা তো প্রতিবছরই চলে। আমরা মনে করেছিলাম এইবার নতুন সরকার সারের দামের সিন্ডিকেট হতে দিবে না। কিন্তু এইবারও গতবারের মত সারে সিন্ডিকেট। সরকার নির্ধারিত দামে আমরা সার কিনতে পারছি না। ধানক্ষেতে দেওয়ার জন্য আগে ২০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া পটাশ ৩০, ২১ টাকার ডিএপি ২৬ ও ইউরিয়া সার ২৭ টাকার স্থলে কিনেছেন ২৯ টাকা কেজিতে আমাদের এখন কিনতে হচ্ছে।”
স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ডিএপি সারের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে এক হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে পাচ্ছি এক হাজার ৪৫০ টাকা। আমরা বাধ্য হয়ে কিনছি। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার বিদিরপুর এলাকার আলম আলী বলেন, “ভাই ফসল করতে এসে আমরা বেকায়দায় পড়েছি। এইবার আলু চাষে এমনিতেই আমরা ধরা খেয়েছি, তার উপরে আবার এখন জমিতে ধান রয়েছে। কিন্তু সারের দামের যে সিন্ডিকেট। তাতে তো আমরা সার কিনে জমিতে দিতে পারছি না। আমি সরকারে দৃষ্টি আর্কষণ করছি যাতে আমরা নায্য মূল্যে সার কিনতে পারি।”
সরেজমিনে গিয়ে আারো দেখা যায়, গত মাস থেকেই রাজশাহী ও এর আশেপাশের অঞ্চলে ভারি বর্ষণে বিলের নিচু জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আর এতে নিচু জমির রোপা-আমণ ধান পচেঁ নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষক সেগুলো জমিতে আবার নতুন ভাবে ধান লাগানো শুরু করেছে।
দূর্গাপুর উপজেলার রহিম আলী নামের এক চাষী বলেন, ‘এইবার যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তা বিগত বছরগুলোতে আর হয়নি। এই মাসে টানা কয়েকদিন বৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে আমাদের জমিগুলোতে পানি জমে ধান পচে গেছে। জমিতে আবার নতুন ভাবে ধান লাগাতে বাড়তি শ্রমিক লাগছে তার উপরে এখন সারের দাম বেশি। এত টাকা খরচ করে ফসলের নায্য দাম না পেলে আমরা মরে যাব। তাই আমরা চাই আমরা যেন স্বল্প মূল্যে সার-বিষ পাই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার বিক্রেতা বলেন, ‘আমরা তো বাড়তি দাম নিচ্ছি না। সরকার যে দাম দিয়েছে তা থেকে পরিবহণ ব্যয়ে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। এটি শুধু আমার এখানেই না। সারাদেশেই তাই নেয়া হয়ে থাকে। তবে যারা অবৈধ মজুত করছে আপনি তাদেরকে ধরতে পারেন। তাদের জন্যই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।’ বাজারে স্থানীয় বিএডিসি ডিলারদের কাছে সারের বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
বিএডিসি থেকে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগে সারের ডিলার রয়েছে প্রায় দুই হাজার। এইবার পর্যাপ্ত সার রয়েছে জানিয়ে বিএডিসি রাজশাহী অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক (সার) কৃষিবিদ জুলফিকার আলী বলেন, ‘এবার আমাদের কোন ধরণে সারের সংকট হবে না। পর্যাপ্ত সার রয়েছে। ডিএপি, টিএসপি, এমওপিসহ সবধরণের সার মিলে এইবার রাজশাহী বরাদ্দ রয়েছে ১৯ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন। আশা করছি কৃষক পর্যাপ্ত সার পাবে।”
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক উম্মে সালমা বলেন, ‘এইবছর সারের কোন ধরণে সংকট হবে না। আমাদের পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তবে কৃষকদের আরো সচেতন হতে হবে। বেশি সার ব্যবহার করলে মাটির উপরের অংশের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণে সার ব্যবহার করতে হবে।’ এই বিষয়ে প্রচারের জন্য তিনি গণমাধ্যম কর্মীদেরও সহযোগীতা চান।