, , ।
সবুজ ইসলাম: চলতি বছর জানুয়ারি মাসে প্রতি বিড়া (৬৪টি পান) বিক্রি করেছিলেন ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, সে একই পান বর্ষা মৌসুমে এসে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। পান চাষিরা বলছেন, এই দামে মুনাফা হওয়া তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই উঠছে না। পানি, শ্রমিক, বাঁশ, জাল, সার- সবকিছুর খরচ উঠিয়ে লাভের কথা ভাবাই যাচ্ছে না। উল্টো প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। বর্ষার শুরুতে পানের বাজারের দর পতন হয়েছে।
মিষ্টি পানের জন্য দেশজুড়ে যে কয়েকটি অঞ্চলের খ্যাতি আছে, তার মধ্যে রাজশাহী অন্যতম। অতিথি আপ্যায়নের এই মিষ্টি পান বিবেচিত হয়ে থাকে। অনেক চাষির জীবিকার ভরসা মিষ্টি পান উৎপাদন। কিন্তু পান উৎপাদনে চাষির ভাগ্যে জুটেছে দুঃখ-যন্ত্রণা। পানের দামে ধস নামায় পান চাষিরা দিশাহারা। অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের ভারে তারা ক্ষতির মুখে। এতে রাজশাহীর কৃষি অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েেছ।
রাজশাহী জেলায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। প্রতিবছর বরজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পান বাজারে আসে। কিন্তু বর্তমানে দাম না পেয়ে পান চাষিদের মাথায় হাত। মোহনপুর, দূর্গাপুর, পবা উপজেলায় পানের চাষ বেশি হয়।
মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের বিদিরপুর এলাকার পান চাষি সাইফুল ইসলাম জানান, পান চাষে তারা পথে বসতে চলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা লোন নিয়ে পান চাষ করেছিলাম। এখন পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকারও বিক্রি করতে পারিনি। হাটে পান নিয়ে গেলে ব্যপারিরা পান কিনতেই চাচ্ছে না। এখন সামনে কি হবে বলতে পারছি না।’
আরেক পান চাষী মালেক উদ্দিন বলেন, বৃষ্টিতে এত কষ্ট করে বর থেকে পান তুলে হাটে গিয়ে দেখি পানের ক্রেতা নাই। বেপারিরা পান কিনতেই চাচ্ছে না। এত টাকা খরচ করে এখন যদি পানের দাম না পাই তাহলে আমরা কি দিয়ে চলবো।
গত বছর পানের দাম ভালো পাওয়ায় পবা উপজেলার বড়গাছি ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের চাষী শিমুল আলী ১৫ কাঠা জমিতে পান লাগিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে খরচের তুলনায় উৎপাদন খরচও উঠছে না।হতাশায় বরজ তুলে নিচ্ছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, পানের বরজে প্রতিদিন শ্রমিক লাগবেই। একেকটি শ্রমিকের মজুরি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। এত টাকা খরচ করার পরেও এখন এসে পানের দাম পাচ্ছি না। তাই জমিতে অন্য আবাদ করার জন্য বরজ ভেঙে ফেলছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি এই পান উৎপাদনে যুক্ত আছেন। গড়ে প্রতিটি বরজে বিনিয়োগ হয়েছে ৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। ধারদেনা করেই বেশিরভাগ পান চাষি বরজে বিনিয়োগ করেছেন। এমন অনেকেই আছেন শেষ সম্বল খরচ করে বরজ বানিয়েছেন। কিন্তু এতে লাভের আশা উড়ে গেছে। পান চাষ বয়ে এনেছে লোকসান।
মাঠ পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা পানের গাছ কেটে ফেলছেন নিজের হাতেই। বরজে পড়ে থাকা পানের আর কোনো বাজার নেই বলে তারা মনে করছেন। পাইকার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে তারা ন্যায্য দামের কাছাকাছিও যেতে পারছেন না। কেউ কেউ ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, আমরা পান চাষ করছি, কিন্তু লাভ কুড়াচ্ছে দালালরা। যারা বরজে ঘাম ঝরায়, তাদের কপালে জোটে শুধু ঋণ আর হতাশা। চাষিরা অভিযোগ করছেন, বর্তমানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সুসংগঠিত দালালচক্র ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। তারাই ঠিক করে দিচ্ছে কে কত দামে পান বিক্রি করবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশাল পরিবহন সংকট এবং পানের সংরক্ষণে কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকা। ফলে চাষিরা সিংহভাগ সময় লোকসানে পান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। নতুবা মাঠেই ফেলে দিয়ে আসছেন।
পান সংরক্ষণে কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই জানিয়ে মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবার বর্ষার সময়ে পানের দাম কমই থাকে। আবার শীতকালে দাম বেশি। দুইমিলে একসাথে করলে পান চাষে কৃষকদের লাভই থাকে। এই সময়টাতে কৃষকদের একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। কাঁচামালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ীরা। পান সংরক্ষণের কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই।’
সার্বিক জানতে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক উম্মে ছালমার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,‘আমার অফিসে একটি মেলার উদ্বোধন আছে। আমি বিস্তারিত জেনে আপনাকে জানাচ্ছি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশহীর জিআই পণ্য মিষ্টি পান সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবদান অনেক। এটি টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তা জরুরি। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু, পানের সংরক্ষণের জন্য স্টোরেজ সুবিধা দিতে হবে। তাহলেই টিকে থাকবে অর্থনীতি সচলকারী মিষ্টি পান।