বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
জুবায়ের জিসান, রাবি: রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, দেশের এক অমূল্য ঐতিহ্যের ধারক। ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি বাংলাদেশের প্রথম এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম প্রত্নসম্পদ সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা হিসেবে খ্যাত। তবে, নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা এই জাদুঘরটি বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য এক বিশেষ স্থান হয়ে উঠেছে। নানা উদ্যোগ, বিদেশি গবেষকদের আগ্রহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও এটি বিপন্নতার পথে চলতে থাকা এক ঐতিহাসিক স্থান।
একসময়ে অব্যবস্থাপনার শিকার হলেও, সম্প্রতি বিদেশি গবেষকদের আগ্রহ, রাষ্ট্রদূতদের পরিদর্শন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে চুক্তির ফলে জাদুঘরটি আবার গতি পেয়েছে। আধুনিক গ্যালারি, থ্রিডি প্রযুক্তি, কয়েন গ্যালারি এবং ডরমিটরি নির্মাণের মতো উদ্যোগের ফলে জাদুঘরটি বর্তমান সময়ে নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে এমন কিছু নিদর্শন, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নেই এবং কিছু নিদর্শন বিশ্বব্যাপী বিরল। এর মধ্যে পাল-সেন শাসনামলে নির্মিত দুই সহস্রাধিক ভাস্কর্য, লাইফ-সাইজ গঙ্গা মূর্তি, অর্ধনারীশ্বর শিব এবং বিভিন্ন ধ্রুপদি শিল্পকলার ভাস্কর্য উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ছয় হাজার বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় লেখা পাণ্ডুলিপি, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মুদ্রা, ১ হাজার ৩০০ পোড়ামাটির নিদর্শন, ১ হাজারের বেশি ধাতব নিদর্শন এবং অন্যান্য মূল্যবান প্রত্নসামগ্রী। এসব নিদর্শন দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ হিসেবে গণ্য হয়। তবে, স্থান সংকুলান না হওয়ায় জাদুঘরের ৯০ শতাংশ প্রত্নসম্পদ এখনো গুদামঘরে তালাবদ্ধ হয়ে রয়েছে, ফলে দর্শনার্থীরা তা দেখতে পাচ্ছেন না।
এছাড়া, পুরনো পুঁথির পাণ্ডুলিপিগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব পাণ্ডুলিপির মধ্যে ৩ হাজার ৯০০টি সংস্কৃত এবং ১ হাজার ৭০০টি বাংলা পাণ্ডুলিপি রয়েছে, এর মধ্যে কিছু পাণ্ডুলিপি ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে লেখা এবং রঙিন চিত্রকর্ম দ্বারা শোভিত। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এসব পাণ্ডুলিপি দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের নবনিযুক্ত পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগের চেয়ে বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সম্প্রতি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে চার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দিয়েছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইউনেসকো চেয়ার অন আর্কিওলজিক্যাল এথিকস অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইন কালচারাল হেরিটেজ এ কর্মসূচির আয়োজন করে।’
তিনি আরো বলেন, এখন প্রতিটি দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাদুঘর পরিদর্শনে যোগাযোগ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে—বিদেশি গবেষক, রাষ্ট্রদূত ও ভিআইপিদের আগমন বাড়ছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও জাদুঘরের জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
এছাড়া জাদুঘরে প্রতিনিয়ত নতুন নিদর্শন যুক্ত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসেই আমরা নতুন নতুন নিদর্শন পাচ্ছি। গতকালও নাচোল রাজবাড়ি থেকে দুটি নিদর্শন নিয়ে এসেছি। এটা আমাদের জাদুঘরের সবচেয়ে বেশি ওজনের।’
স্থানাভাবে বাক্সবন্দি কিছু পুঁথি ও অন্যান্য প্রাচীন সাহিত্য নিদর্শন কী পরিস্থিতিতে আছে জানতে চাইলে ড. মোস্তাফিজুর বলেন, ‘আমাদের জাদুঘরে সিন্ধু সভ্যতার অনেক নিদর্শন রয়েছে যেগুলো কলকাতায়ও নেই। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে এর আরো উন্নতি করা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা। আমরা চাচ্ছি জাদুঘরটিকে আলোকসজ্জা করে আরো আকর্ষণীয় করতে। পাশের দুটি পুরনো ভবন ভেঙে নতুন করে গড়া গেলেও অনেক নিদর্শনের প্রদর্শনী বাড়ানো যাবে। তবে এতে সময় লাগবে।’
অনেকটা আক্ষেপের সুরে পরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর বলেন, ‘এখানে জনবল সংকট তো আছেই। যদিও গবেষকদের সংখ্যা খুবই কম, তবে তাদের থাকার ব্যবস্থা নেই। এজন্য জাদুঘরের পাশেই পুরনো বিল্ডিং ভেঙে তিনতলা ডরমিটরি করার পরিকল্পনা করছি। এছাড়া প্রদর্শনীর জন্য নতুন গ্যালারি লাগবে, থাকার জন্য নতুন বিল্ডিং লাগবে। তবে অনেকগুলো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, বিশেষ করে পুরো জাদুঘরটিকে আলোকসজ্জায় সুসজ্জিত করা হচ্ছে, এখানে থ্রিডি করার কাজ চলছে। আমরা বিশেষভাবে একটা উদ্যোগ নিয়েছি—সম্পূর্ণ একটি রুম ফাঁকা করে কয়েন গ্যালারি করতে চাচ্ছি। শিগগিরই এটি করা হবে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীও প্রয়োজন।’
সবশেষে পরিচালক জানান, রবিবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা, রাবি শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা। তবে গবেষণা ও লাইব্রেরি ব্যবহারের জন্য রাবি শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারেন।
সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, ‘বর্তমানে জাদুঘরটিতে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মচাঞ্চল্য ও কার্যক্রমের পরিসর অনেক বেড়েছে। নতুন উদ্যমে প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে সংগ্রহের উপযোগী সামগ্রী খুঁজে বের করা হচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘জাদুঘরটির আধুনিকায়নের জন্য একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মূল যাদুঘরের প্রত্ননিদর্শনগুলো সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য আলাদা সম্প্রসারিত অংশ তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গবেষকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে, তবে সেটি সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে রাজশাহীতে বিদেশি রাষ্ট্রদূতসহ অনেক গবেষক আসছেন এবং তারা বরেন্দ্র জাদুঘরের গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বলা যায়, জাদুঘরটি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।’
জাদুঘরটি সপ্তাহে ছয় দিন (রবিবার ছাড়া) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা, তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১০ টাকায় প্রবেশ করতে পারেন এবং গবেষণার জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।