, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী শহরের বুকে এক টুকরো স্বাদের ইতিহাস গাঁথা আছে। এটি শুধু জিলাপি নয়, এটি রাজশাহীর মানুষের অনুভূতির অংশ। প্রায় ৬৪ বছর ধরে বাটার মোড়ের ঐতিহ্যবাহী জিলাপি যেমন স্বাদে অতুলনীয়, তেমনি এর গল্পও শেকড় গেঁথেছে সময়ের গভীরে। বাটার মোড়ের ব্যস্ততা একটু বাড়লেই বাতাসে মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই সুবাস যে শুধুই জিলাপির তা নয়, এর সাথে মিশে থাকে রাজশাহীর মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি আর ঐতিহ্যের সুতো।
সময়টা ছিল ষাটের দশক। রাজশাহীর সাহেববাজারের কাছে ছোট্ট এক দোকান খুললেন সোয়েব উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী। তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, তার হাতে তৈরি এই মচমচে জিলাপি একদিন পুরো রাজশাহী বিভাগের মানুষের স্বাদের প্রতীক হয়ে উঠবে। প্রথম দিকে কারিগর ছিলেন যামিনী সাহা, যার নিপুণ হাতে জিলাপির গড়ন পায় তার ঐতিহ্যবাহী প্যাঁচ। এরপর তার ছেলে কালিপদ সাহা সেই দক্ষতা রপ্ত করেন এবং বছর বছর ধরে তা টিকে থাকে।
সোয়েব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার চার ছেলে দোকানের হাল ধরেন। সময়ের পরিক্রমায় এখন তার তিন ছেলে হাসেম উদ্দিন, শামীম ও ইমরান আলী এই স্বাদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের সাথে আছে প্রধান কারিগর সাফাত আলী ও শফিকুল ইসলাম, যারা বছরের পর বছর ধরে এই জিলাপি তৈরির রহস্য বয়ে নিয়ে চলেছেন।
রমজানে এই জিলাপির কদর যেন আকাশ ছোঁয়া। ইফতারের আগের মাত্র এক ঘণ্টায় বিক্রি হয় পাঁচ মণ জিলাপি। এত ভিড় যে, দোকানের কর্মচারীরা দম ফেলার সময় পান না। ক্রেতাদের উৎসাহ দেখে মনে হয়, তারা শুধু জিলাপি কিনতে আসেন না, বরং ঐতিহ্যের অংশ হতে আসেন।
প্রতিদিন বিকাল গড়াতেই দোকানের সামনে রোজাদারদের লাইন পড়ে যায়। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এক টুকরো সুস্বাদের জন্য। কেউ মেসের জন্য, কেউবা পরিবারের জন্য, কেউবা শুধু সেই পুরোনো স্মৃতি রক্ষার জন্য।
অনেকেই জানতে চান, এই জিলাপির এমন স্বাদ কেন? উত্তরে কারিগর শফিকুল হাসেন বলেন, গোপন ফর্মুলা। তবে কিছু রহস্য ফাঁস করা যায় চালের আটা, ময়দা ও মাষকলাইয়ের আটা মিশিয়ে বানানো হয় এই জিলাপির ব্যাটার। তারপর সেটিকে কয়েক ঘণ্টা রেখে বিশেষ কৌশলে ভাজা হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এখানে কোনো কেমিক্যাল বা কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না।
একজন ক্রেতার ভাষায়, এই জিলাপির যে মচমচে ভাব, তা কোনো সাধারণ জিলাপিতে পাওয়া যায় না। এমনকি ইফতারের ঘণ্টাখানেক পরেও এটি ঠিক তেমনই থাকে।
বর্তমানে রাজশাহীর সাধারণ জিলাপির দোকানে প্রতি কেজি জিলাপির দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা হলেও, এত নাম ডাকের পরেও বাটার মোড়ের ঐতিহ্যবাহী জিলাপি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪০ টাকায়। ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য লাভ নয়, বরং ঐতিহ্য ধরে রাখা বলে জানান দোকানের মালিকরা। তাই ক্রেতারা স্বাদ ও গুণগত মানের নিশ্চয়তা পেয়েও তুলনামূলক কম দামে এখানকার জিলাপি কিনতে পারেন।
এই জিলাপি খেতে আসেন ৫০ বছরের শাজাহান ইসলাম। তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবা আমাকে এই জিলাপি খাওয়াতেন। আজ আমি আমার ছেলেকে এনে দিচ্ছি। এক যুগ পরেও এই স্বাদ একই আছে, এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা।
রাজশাহীতে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বাটার মোড়ের জিলাপি সেই একই রয়ে গেছে। একে শুধুই জিলাপি বলা ভুল হবে, এটি প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের এক স্বাদের সেতু।
মাহমুদুল হাসান নামের এক নিয়মিত ক্রেতা বলেন, এই জিলাপির আসল বিশেষত্ব হলো এর দীর্ঘস্থায়ী মচমচে ভাব। অন্য জিলাপি কিছুক্ষণ পর নরম হয়ে যায়, কিন্তু বাটার মোড়ের জিলাপি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মচমচে থাকে। তাই শুধু ইফতার নয়, আমরা অনেক সময় রাতেও এই জিলাপি খাই।
তিনি আরও বলেন, বাজারে অনেক ধরনের জিলাপি পাওয়া যায়, কিন্তু এই জিলাপির যে স্বাদ, তা আর কোথাও নেই। দামও তুলনামূলক কম। এত বছরেও মালিকরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, এটাই সবচেয়ে প্রশংসার বিষয়।
শুধু রাজশাহী নয়, যে কোনো শহরের পরিচিতি গড়ে ওঠে তার নিজস্ব ঐতিহ্য আর খাবারের স্বাদে। রাজশাহীর বাটার মোড়ের জিলাপি তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। নামহীন এই ছোট্ট দোকান আজ এক বিশাল পরিচিতি বয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু স্বাদ নয়, বরং গল্পের এক অংশ হয়ে গেছে এই জিলাপি।