মাদকে ধরাছোঁয়ার বাইরে কারবারিরা

স্টাফ রিপোর্টার, পুঠিয়া: রাজশাহীর পুঠিয়া ও বানেশ্বরের পাড়া-মহল্লায় মাদকের কারবার ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে। গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও হেরোইনের পাশাপাশি চোলাই মদের উৎপাদন ও বিক্রিও বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে মাদকাসক্ত ও খুচরা বিক্রেতাদের আটক করা হলেও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুঠিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আদিবাসী পাড়ায় চোলাই মদের উৎপাদন ও বিক্রি বেড়েছে। পরিত্যক্ত কোমল পানীয়ের বোতলে মদ ভরে তা চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব মদ পান করে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এমনকি মদ কিনতে এসে কেউ কেউ চুরির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, আগে সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাসের অভিযানে ওই এলাকায় চোলাই মদের উৎপাদন ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তাদের দাবি, থানা থেকে প্রায় ৬০০ মিটার দূরে এমন কারবার চলার অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যমান তৎপরতা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
শুধু আদিবাসী পাড়াই নয়, পুঠিয়া বাজার, মোল্লাপাড়া, কান্দ্রা গুচ্ছগ্রাম, ধোপাপাড়া, ফুলবাড়ি, নামাজগ্রাম, শিবপুর বাজার, বানেশ্বর হাট, বানেশ্বর পূর্বপাড়া (মিস্ত্রিপাড়া), খুটিপাড়া, গরুহাটা, শিবপুরহাট, বিড়ালদহ, পীরগাছা তালুকদার গুচ্ছগ্রাম ও ঝলমলিয়া বাজারেও মাদক কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। বেলপুকুর থানা এলাকার বেলপুকুর, ভড়ুয়াপাড়া, জামিরা, ডিসির মোড় ও বগারটেকেও মাদকের কারবার চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মাদক কেনাবেচা চললেও মূল সরবরাহচক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চোখে পড়ছে না। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কয়েকজন আটক হলেও তাতে মাদকের বিস্তার কতটা কমছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় মাদক উৎপাদন, বিক্রি ও কারবারের পরিমাণ সম্পর্কে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদক কারবারের সঙ্গে কিশোর-যুবকদের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। অর্থের প্রলোভনে তরুণদের দিয়ে মাদক সরবরাহের কাজ করানো হলে তার প্রভাব শুধু আইনশৃঙ্খলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে পরিবার ও সমাজেও—এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের।
বাসিন্দাদের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযান যেন কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু আটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। চিহ্নিত কারবারিদের শনাক্ত করা, মাদকের উৎস ও সরবরাহপথ অনুসন্ধান, চোলাই মদের উৎপাদন বন্ধ এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বানেশ্বর শাখার ইনচার্জ হেলাল উদ্দিন বলেন, তাদের তালিকায় বর্তমানে ২২ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। প্রতি মাসে নতুন নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়। তার দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং মামলা হচ্ছে। তবে আট জনকে নিয়ে উপজেলায় দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে জানিয়েছেন হেলাল উদ্দিন। তার বক্তব্য, জনবল-সংকটের কারণে সব সময় অফিস খোলা রাখা সম্ভব হয় না।
পুঠিয়া থানার ইনচার্জ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, পুঠিয়ায় প্রকাশ্যে কোথাও মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে তার জানা নেই; যা হচ্ছে, গোপনে হচ্ছে। পুলিশের কাছে নির্দিষ্ট কোনও মাদক কারবারি বা মাদক স্পটের তালিকাও নেই বলে জানান তিনি।
একই উপজেলার মাদক পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের দাবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় থাকা ২২ জনের বাইরে আর কতজন কারবারে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট তালিকা না থাকার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কতটি অভিযান, মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে, সেই তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, মাদকের উৎস ও সরবরাহপথ শনাক্ত করা, চোলাই মদের উৎপাদন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মধ্যে সমন্বয়। বিশেষ করে কিশোর-যুবকদের মাদক কারবারে ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


প্রকাশিত: October 24, 2026 | সময়: 6:05 am | সুমন শেখ