সর্বশেষ সংবাদ :

এআই প্রযুক্তিতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাফল্য, নেতৃত্বে বদলগাছীর নাফিউ

বদলগাছী প্রতিনিধি: ৩৭টি দেশের কয়েক শ দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে টিম এআই বিডি। নওগাঁর বদলগাছীর সন্তান আবু নাছের মুহা. নাফিউ এর নেতৃত্বে দলটি জাতিসংঘের বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হ্যাকাথন ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত গ্র্যান্ড ফাইনালে আন্তর্জাতিক বিচারকেরা বাংলাদেশকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। দলটির তৈরি এআই প্ল্যাটফর্ম ‘ক্লজচেইন’ সাফল্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্ল্যাটফর্মটি বিভিন্ন দেশের আইন ও বিধিমালা বিশ্লেষণের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই করতে পারে।
নাফিউ বদলগাছী সদর ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া এলাকার শিক্ষক আবুল হোসেনের ছেলে। তিনি বদলগাছী সরকারি মডেল পাইলট হাইস্কুলের ২০১০ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর এই আন্তর্জাতিক অর্জনে গর্বিত সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ বদলগাছীর সর্বস্তরের মানুষ।
দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্কের (বিডিরেন) ব্যবস্থাপক (ইনোভেশন) ও এআই প্রকৌশলী আবু নাছের মুহা. নাফিউ। দলের অন্য সদস্যরা হলেন বিডিরেনের সিনিয়র ডেভেলপার ও এআই প্রকৌশলী পুনম চৌধুরী, এআই প্রকৌশলী সানিউল বাসির সাজ এবং আইনি পর্যালোচক ইনসাফুল রহমান তুষার। গবেষণা তত্ত্বাবধানে ছিলেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নওশিন আমিন শেখ।
‘ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল হ্যাকাথন ২০২৬ ইউজিং এআই ফর ডিজিটাল ট্রেড রেগুলেটরি অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক এ প্রতিযোগিতার আয়োজক জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন। বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত আইন বিশ্লেষণে সহায়ক উন্মুক্ত এআই প্রযুক্তি তৈরি করাই ছিল এ প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য।
পাঁচ মাস ধরে কয়েক ধাপের বাছাইপ্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের দল। ফাইনালে প্রতিটি দলকে আগে থেকে জানানো হয়নি—এমন একটি দেশ ও নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সরাসরি পরীক্ষা দিতে হয়। বিচারকেরা নিজেরাই প্রতিটি দলের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এর কার্যকারিতা যাচাই করেন। উপস্থাপনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়।
দলটির তথ্য অনুযায়ী, ক্লজচেইন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও পূর্ব তিমুর—এই ১১টি দেশের আইন বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। ১ হাজার ৪৯টি সরকারি উৎস থেকে সংগৃহীত ৭৪৬টি আইন ও বিধিমালা থেকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি আইনি ধারা। পুরো প্ল্যাটফর্মটি উন্মুক্ত সোর্স প্রযুক্তিতে তৈরি।
দেশের অবকাঠামোতেই বিশ্বমানের এআই এ সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন)। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ডেটা সেন্টারে থাকা এনভিডিয়া ডিজিএক্স স্পার্ক কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে দলটি নিজস্বভাবে ভাষা মডেল, টেক্সট বিশ্লেষণ মডেল ও ওসিআর প্রযুক্তি চালাতে সক্ষম হয়। ফলে বিদেশি বাণিজ্যিক এআই সেবা কিংবা এপিআইয়ের ওপর নির্ভর না করেই পুরো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রতিযোগিতার মূল্যায়নেও এ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দলনেতা নাফিউ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যার প্রতিটি তথ্য মূল সরকারি নথি পর্যন্ত যাচাই করা যায়। বিডিরেনের ডেটা সেন্টারের ডিজিএক্স স্পার্ক আমাদের দেখিয়েছে, বাংলাদেশের নিজস্ব অবকাঠামোতেই বিশ্বমানের এআই চালানো সম্ভব। এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের।’
নাফিউ ফেসবুকে সাফল্যের খবর প্রকাশ করার পর থেকেই বদলগাছীর বিভিন্ন বয়সী ও সর্বস্তরের মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
বদলগাছী সরকারি মডেল পাইলট হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক মুজাফফর হোসেন উকিল বলেন, ‘নাফিউ খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে, অষ্টম শ্রেণিতেও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে উপজেলা সেরা হয়েছে। এরপর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে আবারও উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে। তার এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে শিক্ষক হিসেবে আমি সত্যিই অনেক গর্বিত। তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইল।’


প্রকাশিত: October 23, 2026 | সময়: 5:34 am | সুমন শেখ