সর্বশেষ সংবাদ :

পত্নীতলায় সহকারী প্রধান শিক্ষককে পাশ কাটিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব

স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ: নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার সুবরাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষককে পাশ কাটিয়ে এক সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি ও ওই সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসান। অভিযোগের পর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনও দিয়েছেন। তবে অভিযোগের প্রায় তিন মাস পরও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালামের চাকরির শেষ কর্মদিবস ছিল গত ১৪ জুন। ওইদিন তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
এর পরদিন ১৫ জুন বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি সুরুজ হোসেন চৌধুরী কয়েকজন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে সহকারী শিক্ষক বিশ্বনাথ দাসকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশ্বনাথ দাস ওই এডহক কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসান সভাপতির কাছে এ দায়িত্ব দেওয়ার কাগজপত্র দেখতে চাইলে সভাপতি তাঁকে বলেন, ‘বে-আইনিভাবে দায়িত্ব দিলাম, আপনি আইনগতভাবে এই পদে আসেন।’ এরপর বিষয়টি নিয়ে ১৬ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং ২০ জুন শিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেন মোছাদ্দেক হাসান। অভিযোগ পাওয়ার পর ২০ জুন বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্তে যান জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাদত হোসেন।
তদন্ত শেষে সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসানকে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়নি। পরে গত ২২ জুলাই ডাকযোগে তিনি ১২ ও ১৯ জুলাই তারিখের দুটি কৈফিয়ত তলবের চিঠি পান।
অভিযোগকারী মোছাদ্দেক হাসানের দাবি, বিধি অনুযায়ী তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁকে সরিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পর তাঁকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে এডহক কমিটির এক অভিভাবক সদস্য দিলিপ কুমার পদত্যাগ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে চার সদস্যের এডহক কমিটিতে সভাপতি সুরুজ হোসেন চৌধুরী ও শিক্ষক প্রতিনিধি বিশ্বনাথ দাস—এই দুজন রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দুজনের সিদ্ধান্ত ও রেজুলেশনের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্বনাথ দাসের বিরুদ্ধে তাঁর বি.এড সনদ জাল হওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমার বি.এডের কোনো জাল সনদ নেই।’
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে বিশ্বনাথ দাস বলেন, ‘এডহক কমিটির সভাপতি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি সেই দায়িত্ব পালন করছি। এখানে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি।’
এডহক কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি হয়েও একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়া যায় কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি আমার জানা নেই।’
চার সদস্যের এডহক কমিটির দুজন না থাকায় অবশিষ্ট দুজনের একজন সভাপতি এবং অন্যজন শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে থাকা অবস্থায় তাঁকে কীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের জবাবে বিশ্বনাথ দাস বলেন, ‘সভাপতি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তাই আমি দায়িত্ব পালন করছি। তিনি আমাকে চলে যেতে বললে আমি চলে যাব।’
এডহক কমিটির সভাপতি সুরুজ হোসেন চৌধুরী অবশ্য কাউকে অবৈধভাবে বা জোর করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে অবৈধভাবে বা জোরপূর্বক দায়িত্ব দিইনি।’ এডহক কমিটির সদস্য বর্তমানে দুজন—এ কথা স্বীকার করেন তিনি।
তবে সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় তাঁকে পাশ কাটিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, চার সদস্যের কমিটির দুজন সদস্য না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে কি না এবং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে পারেন কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি সভাপতি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন বলেন, কোনো বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় অন্য কোনো শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ে যা হয়েছে, তা বিধিবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষককে দায়িত্ব না দিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্টো তাঁকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এডহক কমিটি এভাবে তাঁকে বরখাস্ত করতে পারে না।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, তিনি সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে বিষয়টি তদন্ত করেছেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছেন।


প্রকাশিত: September 30, 2026 | সময়: 7:44 am | সুমন শেখ