সর্বশেষ সংবাদ :

নিজ খরচে স্কুলে আসেন ৩ শিক্ষক, বিনা বেতনে ২৮ বছর পাঠদান!

সবুজ ইসলাম: “১৯৯৮ সাল থেকে আমরা এখানে শিক্ষকতা করছি। আমাদের কোনো বেতন নেই। নিজেদের খরচেই স্কুলে নিয়মিত আসি এবং বাচ্চাদের পড়াশোনা করাই। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো একদিন স্কুলটি জাতীয়করণ হবে, তখন আমরা বেতন পাব। কিন্তু টানা ২৮ বছর হয়ে গেল, এখনো কোনো বেতন পাইনি।”-আক্ষেপ মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সিন্দুর কুসুম্বি কাজিপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হোসনেয়ারা খাতুন। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে কোনো ধরনের মাসিক বেতন বা নিয়মিত আর্থিক সুবিধা ছাড়াই তিনি শিশুদের পাঠদান করে আসছেন।
শুধু হোসনেয়ারা খাতুন নন, তার মতো আরও কয়েকজন শিক্ষক বছরের পর বছর বিনা পারিশ্রমিকে বিদ্যালয়টিতে পাঠদান করে যাচ্ছেন। নিজেদের সংসার, ব্যক্তিগত খরচ ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা স্কুলে এসে শিশুদের পড়াচ্ছেন। তাদের একমাত্র প্রত্যাশা একদিন বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি ও জাতীয়করণ পাবে, শিক্ষকরা পাবেন প্রাপ্য সম্মান ও বেতন।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে সিন্দুর কুসুম্বি কাজিপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চার কক্ষের একটি টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বিদ্যালয়ের টিনগুলোতে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কাঠামোর ছাপ স্পষ্ট। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্লাস করছেন শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির ২৬ জন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছিলেন সহকারী শিক্ষক হোসনেয়ারা খাতুন। চারপাশে যখন নানা প্রতিকূলতা, তখনও শিশুদের বই পড়ার শব্দে মুখর হয়ে উঠেছিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। শিক্ষকরা জানান, বিদ্যালয়টিতে মোট চারজন শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন অনিয়মিত হলেও বাকি তিনজন নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ে এসে পাঠদান করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা কোনো নিয়মিত বেতন পাননি।
স্থানীয়দের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে ১৯৯৮ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। নওহাটা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে কাছাকাছি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোগী হয়ে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশু এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। অনেক শিক্ষার্থী এখান থেকে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে গেছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখনো রয়ে গেছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
প্রধান শিক্ষক এলিজা খাতুন বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষকরা বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন। সরকারি বিভিন্ন অনুদান মাঝেমধ্যে পাওয়া গেলেও তা বিদ্যালয়ের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। সেই অর্থ দিয়ে কোনোভাবে সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় কাজ চালানো হয়। তিনি বলেন, “নওহাটা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় ১৯৯৮ সালে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষকেরা কোনো বেতন পান না। এত বছর ধরে আমরা বিনা বেতনেই পাঠদান করাচ্ছি। আমাদের আশা, কোনো একদিন বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হবে এবং আমরা বেতন পাব।”
বিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে। তবে নিয়মিত উপস্থিত থাকে ৫০ থেকে ৬০ জন। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই আশপাশের এলাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের সন্তান। বিদ্যালয়টি ছোট হলেও শিক্ষার্থীদের সাফল্য রয়েছে বলে জানান শিক্ষকরা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টির তিনজন করে শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। ২০১৯ ও ২০২২ সালেও দুজন করে শিক্ষার্থী বৃত্তি অর্জন করেছে। শিক্ষকদের দাবি, সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোগত সংকট থাকলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে তারা কোনো ধরনের অবহেলা করেন না। বরং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য চেষ্টা করেন।
‘২৮ বছর বিনা বেতনে কাজ করবে এমন মানুষ কোথায়?’
সহকারী শিক্ষিকা শাবানা খাতুনের কণ্ঠেও ছিল দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও অভিমানের ছাপ। তিনি বলেন, “প্রায় ২৮ বছর বিনা বেতনে কাজ করবে এমন মানুষ কি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে? কিন্তু আমরা সেই কাজটিই করছি। আমরা বেতনের কথা না ভেবে শিক্ষার কথা ভেবেছি। দীর্ঘদিন পড়াতে পড়াতে আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। আগে চাইলে অন্য কোথাও চলে যেতে পারতাম। কিন্তু এখন এই স্কুল, এই বাচ্চাদের সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এখনো আশায় আছি, আমাদের এই স্কুলটি একদিন জাতীয়করণ হবে। তখন আমরা হয়তো আমাদের শ্রমের মূল্য পাব।” শাবানা খাতুনের কথায়, দীর্ঘ সময় ধরে বিনা বেতনে কাজ করলেও শিক্ষার্থীদের মুখের হাসি এবং তাদের ভালো ফলাফলই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এসময় বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। তারা জানান, এলাকার কাছাকাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় এই বিদ্যালয়টি তাদের সন্তানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দূরের স্কুলে ছোট শিশুদের নিয়মিত পাঠানো অনেক পরিবারের জন্যই কষ্টকর। অভিভাবক রাকিমা খাতুন বলেন, “নওহাটা প্রাইমারি স্কুল এখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। পাশের নামোপাড়া স্কুলও প্রায় একই দূরত্বে। আমাদের বাড়ির কাছে এই স্কুল হওয়ায় আমরা সন্তানদের এখানে ভর্তি করিয়েছি। আমরা জানি, এই স্কুলের ম্যাডামরা কোনো বেতন পান না। তারপরও তারা অনেক ভালো করে বাচ্চাদের পড়ান।”
আরেক অভিভাবক সুরাইয়া মিম বলেন, “অন্য স্কুলের মতো এই স্কুলেও ম্যাডামরা বাচ্চাদের সুন্দরভাবে পড়াশোনা করান। এখান থেকে অনেক ছেলে-মেয়ে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ভালো স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুল ছোট হলেও পড়ার মান ভালো। তাই আমরা আমাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করিয়েছি।”
বিষয়টি মানবিকঃ
স্কুলের ম্যানেজিং কমেটির সভাপতি কাউসার আলী বলেন,“নওহাটা পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক সরকারি প্রাথামিক বিদ্যালয় আছে। শুধুমাত্র ২ নম্বর ওয়ার্ডে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। তাই এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ১৯৯৮ সালে একবিঘা জমির উপরে এই স্কুলটি নিমার্ণ করা হয়েছিল। এতদিন পার হয়ে গেলেও শিক্ষকেরা এখন পর্যন্ত কোন বেতন পান না। তারা বিনা বেতনেই পাঠদান করাচ্ছেন। বিষয়টি খুবই কষ্টের ও মানবিক। স্কুলটি জাতীয়করণ করতে শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়া আছে। আমরা আশা করছি এরপরে সরকার যখন প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ ঘোষণা করবে তখন সিন্দুর কুসুম্বি কাজিপাড়া স্কুলের নাম আসবে।”
পবা উপজেলা শিক্ষা অফিসার জোবায়দা রওশন জাহানের কাছে বিদ্যালয়টির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্কুলটি এখনো যেহেতু রেজিস্ট্রেশন হয়নি, তাই আমাদের কিছু করার নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সব প্রসেস সম্পন্ন করলে তখন আমরা এ বিষয়ে বলতে পারব। তবে আমরা জানি, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কয়েকজন শিক্ষক বিনা বেতনে শিক্ষকতা করাচ্ছেন। বিষয়টি মানবিক।”
তবে নওহাটা পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী মাহবুবুর রহমান দুলাল বলেন,“আমি নির্বাচিত হলে সিন্দুর কুসুম্বী কাজীপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি যতদিন জাতীয়করণ না হবে ততদিন পৌরসভার পক্ষ থেকে শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়া হবে।”
সিন্দুর কুসুম্বি কাজিপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়তো নেই আধুনিক ভবন, নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু সেখানে প্রতিদিন যে পাঠদান হয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকজন শিক্ষকের জীবনের প্রায় তিন দশকের গল্প।


প্রকাশিত: August 20, 2026 | সময়: 4:12 am | সুমন শেখ