সর্বশেষ সংবাদ :

পাপিয়া বিদায়ের দিন যারা কেঁদেছিল,পদোন্নতিতে আজ তারা হাসছেন

নুরুজ্জামান,বাঘা :

চার বছর পুর্বে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর কর্মস্থল থেকে বিদায় নেন। নিয়ম অনুযায়ী ফুল , ক্রেস্ট আর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় একটি অধ্যায়ের। কিন্তু রাজশাহীর বাঘায় পাপিয়া সুলতানার বিদায় ছিল কিছুটা অন্য রকম। একের পর এক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ, সাংবাদিক, স্কাউট সদস্য ও সামাজিক সংগঠনের মানুষ তাঁকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন। তাদের কারো হাতে ছিলো ফুল , কারও হাতে ক্রেস্ট , কারো হাতে ক্ষুত্র উপহার ,সাথে ছিলে ছিল ভালোবাসা আর আবেগ।

 

২০২২ সালের জুনে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব শেষে কর্মস্থল ছাড়েন পাপিয়া সুলতানা। ১২ জুন ছিল তাঁর বিদায়ের দিন। বিদায় অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন বাঘার মানুষের প্রতি। দির্ঘ চার বছর পর আবারও আলোচনায় সেই পাপিয়া সুলতানা। এবার তাঁর পদোন্নতির খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দনের বার্তা দিচ্ছেন বাঘার মানুষ। সরকারের উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। সাবেক এই ইউএনওর সাফল্যে আনন্দিত ও গর্বিত পুরো বাঘাবাসী।

বিদায়ের আগে একের পর এক সংবর্ধনা :
পাপিয়া সুলতানার বিদায়ের সময় বাঘার বিভিন্ন মহল পৃথকভাবে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। উপজেলা অফিসার্স ক্লাব, উপজেলা পরিষদ, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কাউট, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা, বাঘা প্রেস ক্লাব-সহ সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ফুল ও ক্রেস্ট দিয়ে তাঁকে বিদায় জানায়। একজন কর্মকর্তার বদলি বা বিদায় সরকারি চাকরিতে স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একটি উপজেলার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত বিদায় সব কর্মকর্তার ভাগ্যে জোটে না।
বাঘার মানুষের কাছে পাপিয়া সুলতানার পরিচয় তাই শুধু একজন ‘ইউএনও’ হিসেবে নয়। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন সহজে কাছে যাওয়া যায় এমন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা । কারও কাছে পাপিয়া আপা খুবই মহৎ একজন মানুষ। সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে গতিশীল করায় ছিলো তার একমাত্র লক্ষ্য । তাই অনেকেই মন্তব্য করতে, এই ম্যাডাম একদিন অনেক বড় কিছু অর্জন করবেন।

দরজা খোলা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য :
তাঁর কর্মকাল নিয়ে বাঘার মানুষের যে স্মৃতিগুলো এখনো ঘুরে ফিরে আসে, তার অন্যতম হলো-সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর উন্মুক্ত দরজা। কোনো সমস্যা নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যেতে হলে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, এমন ধারণা তিনি অনেকটাই বদলে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেতেন। সৎ, নির্ভীক ও সদালাপী কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল মানুষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ।

উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগ :
বাঘায় দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানবিক কাজেও যুক্ত ছিলেন পাপিয়া সুলতানা। কোরবানির ঈদে নিজে গরু কোরবানি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণ করেছিলেন তিনি। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাইসাইকেল। শিক্ষার প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। বাঘার মানুষের স্মৃতিতে এসব ঘটনা এখনো ঘুরে বেড়ায়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য বাইসাইকেল কিনে দেওয়া ,বই কিনে দেয়া, কলেজে ভর্তির টাকা ইত্যার্দি উদ্যোগ এর কারনে অনেকের কাছে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। দূরের পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাইসাইকেল যেমন ছিল প্রয়োজনের জিনিস, তেমনি ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

শুদ্ধাচার পুরস্কারেও স্বীকৃতি :
কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন পাপিয়া সুলতানা। বাঘায় দায়িত্ব পালনের সময় তিনি রাজশাহী জেলায় জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত হন। সততা, দায়িত্বশীলতা ও জনসেবার ক্ষেত্রে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এই পুরস্কার তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন।

বাঘার মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন :
বিদায়ের দিন আবেগ সামলাতে পারেননি পাপিয়া সুলতানা। ফুল-ক্রেস্ট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে, কর্মস্থল ছাড়ার দিন মানুষ তাঁকে ধরে রাখতে চায়, আর বিদায়ের পরও তাঁর কথা মনে রাখে। পাপিয়া সুলতানার ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কটি যেন আরও একবার স্পষ্ট হলো তাঁর পদোন্নতির খবরে।

চার বছর পরও স্মৃতিতে অমলিন :
২০২২ সালে বাঘা থেকে চলে যাওয়ার পর সময় গড়িয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বে এসেছে পরিবর্তন, বদলেছে অনেক মুখ। কিন্তু বাঘার মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি পাপিয়া সুলতানার নাম। সম্প্রতি তাঁর উপসচিব পদে পদোন্নতির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বাঘার বিভিন্ন মহল থেকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে তাঁকে। কেউ তাঁর সততার কথা লিখেছেন, কেউ মানবিকতার কথা স্মরণ করেছেন। কেউবা স্মরণ করেছেন বিদায়ের সেই আবেগঘন দিন। অনেকেই বাঘায় দাওয়াত দিচ্ছেন।

একজন কর্মকর্তার সাফল্যে সাবেক কর্মস্থলের মানুষ যখন নিজেদের সাফল্য মনে করে আনন্দিত হন, তখন বোঝা যায়, কর্মকর্তা ও জনগণের সম্পর্কটি শুধু প্রশাসনিক ছিল না। বাঘার মানুষ পাপিয়া সুলতানাকে হয়তো চার বছর আগে বিদায় জানিয়েছিল। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা থেকে তিনি বিদায় নেননি।পদ বদলেছে, কর্মস্থল বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে। বদলায়নি বাঘার মানুষের স্মৃতিতে তাঁর জায়গাটি। উপসচিব পদে তাঁর পদোন্নতিতে তাই বাঘার মানুষের কণ্ঠে অভিনন্দনের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে একটাই কথা ‘পাপিয়া সুলতানা আমাদের গর্ব।’

সানশাইন /শামি


প্রকাশিত: August 18, 2026 | সময়: 12:40 pm | Daily Sunshine