, , ।
মোকাররম হোসাইন, কালাই: উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে কৃষি অর্থনীতির বিকাশ, জমির মূল্য বৃদ্ধি এবং নান্দনিক পরিবেশ মিলিয়ে জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা। কাঁদামাটির সড়কগুলো রূপ নিতে শুরু করেছে নান্দনিক সড়কে। পৌরবাসীর প্রত্যাশা, চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে এই পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর আরও বিস্তৃত লাভ করবে। গ্রামীন জনপদে এমন নান্দনিক সড়ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
মাত্র কয়েক বছর আগের কথা, বর্ষা এলেই এসব সড়কে জমে থাকত হাঁটুপানি সহ কাদা। আবার শুস্ক মৌসুমে এলেই ফুটে উঠত ভাঙাচোরা পথ। আলু-ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকরা মাথায় করে ফসল আনতো। নানা দৃশ্যই চখে পড়ত। বর্তমানে সেই দৃশ্যগুলো অনেকটাই অতীত।
জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া মাঠের ভিতরে সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে চলে গেছে আরসিসি সড়ক। এই রাস্তাগুলোর দুই পাশে নান্দনিক সারিবদ্ধ সুপারি গাছ, সৌরবিদ্যুৎচালিত স্ট্রিটলাইট, টাইলস বসানো বসার বেঞ্চ বিস্তৃত সবুজ মাঠের বুকে এমন এক দৃশ্য ফুটে ওঠেছে, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। মূলগ্রামের অভ্যন্তরে আরও ৯০০ মিটার সড়কে বসানো হয়েছে পেভিং ব্লক। এ দুই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সড়কের দুই পাশে সারি সারি সুপারি গাছের পাতার মৃদু দোল, নির্দিষ্ট দূরত্বে সৌরচালিত স্ট্রিটলাইট, মাঝেমধ্যে বসার বেঞ্চ পরিবেশকে দিয়েছে নান্দনিক রূপ। সন্ধ্যার পর সোলার লাইটের আলোয় নিরাপদে চলাচল করা যাচ্ছে। সাথে সবুজ ফসলের মাঠ তৈরি করেছে অন্য রকম এক আবহ। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে পথটি এখন সকাল-বিকেলের হাঁটা ও অবকাশযাপনেরও প্রিয় ঠিকানা।
মূলগ্রাম মহল্লার বাসিন্দা শামসুল আলম সাধু ও মহসিন আলী জানান, মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনা, বর্ষা বা শুস্ক মৌসুমে জমি থেকে ধান বা সবজি আনা-নেওয়া ছিল চরম কষ্টের। সেই সড়কে এখন ট্রাক-ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন মাঠের কাছাকাছি যেতে পারছে। এতে সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে কি দেখেছি আর এখন কি দেখছি। সময়ের সাথে সবকিছুর পরিবর্তন ঘটেছে, যা মানুষের কল্যাণের জন্যই।
ওই মহল্লার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি ডায়াবেটিসের রোগী, সকাল-বিকাল হাঁটতে হয়। এই সড়কে হাঁটতে খুব ভালো লাগে। মাঠের মধ্যে এত সুন্দর রাস্তা হবে, তা কল্পনার বাইরে ছিল।
সড়কটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিরাজোম মুনিরা শাওন। তার বাড়ি পৌরসভার আঁওড়া মহল্লায়। তিনি বলেন, বাড়িতে আসলেই যে কয়দিন থাকি, সেই কয়দিনই ওই সড়ক দুটিতে বেড়াতে যাই। সারি সারি সুপারি গাছগুলো দেখে মনে হয় যেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে খোলা মাঠের হাওয়া উপভোগ করা সত্যিই অসাধারণ।
পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গত এক বছরে পৌর এলাকায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮ কিলোমিটার রাস্তা ও ৫ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। এসব উন্নয়নের সুফল পাচ্ছেন পৌরসভার ২৩ হাজার ৬৬৩ জন নাগরিক। সূত্রে আরও জানা যায়, জয়পুরহাট-২ আসনের সাংসদ, জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর বিশেষ বরাদ্দে মূলগ্রাম, সীতাহার, থুপসাড়া, আঁওড়া, সড়াইল, মুন্সীপাড়া, পাঁচশিরা, স্থানীয় হাসপাতাল ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলে মোট ৩৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কালাই ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রেজাউল করিম বলেন, পৌর এলাকায় পাকা সড়কের কারণে জমির দাম বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, কিছুদিন আগেও যেসব জমির প্রতি শতকের দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, পাকা সড়ক নির্মাণের পর সেসব জমির দাম বেড়ে দাড়িয়েছে ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা। অর্থাৎ কোনো কোনো এলাকায় জমির মূল্য প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, রাস্তার দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে লাগানো সুপারি গাছ যুক্ত হওয়ায় যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশাপাশি এ এলাকার পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিমন্ত্রী মহোদয় একযোগে ৩৫টি প্রকল্পের উদ্বোধন করার পর আমরা টেকসই ও আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমাদের মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা দফায় দফায় সরেজমিনে প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করে এসব নান্দনিক দৃশ্য দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সুপারি গাছ বেছে নেওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যান্য গাছ ফসলের আলো-বাতাসে বাধা সৃষ্টি করে জমির ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সুপারি গাছ পরিবেশবান্ধব এবং ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। রাস্তার দুইপাশে রোপণ করা ২ হাজার ৫০০টি সুপারি গাছ রয়েছে। কয়েক বছরের মাথায় প্রতিটি গাছ বছরে দুই দফায় গড়ে ৬০০টি ফল দিলে সর্বনিম্ন ৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও প্রতি বছর সুপারি বিক্রি থেকেই পৌরসভার ফান্ডে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বাড়তি রাজস্ব যোগ হবে। এটি কোনো কল্পনা নয়, বাস্তব হিসাব। আগামীতে প্রকল্পগুলোতেও টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও অর্থকরী মডেল অনুসরণ করা হবে।