রাজশাহীর পাটজাগে দুঃচিন্তার ছাপ

স্টাফ রিপোর্টার: পরিবেশবান্ধব হওয়ায় সময়ের দাবিতে আবারো পাটের কদর বেড়েছে। বর্তমানে বেড়েছে পাটের আবাদ। বেসরকারি উদ্যোগে হলেও পাটকল চালু হওয়ায় চাষিরাও আবাদে লাভবান হচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে এবারে রাজশাহী এলাকায় পাটজাগের মত পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন চাষিরা।
একসময় দেশের কৃষকের অর্থকরি ফসল ও জীবিকার অবলম্বন ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে খ্যাত এই ফসলের গৌরবময় অতীত থাকলেও সস্তাদামের সিনথেটিক তন্তুর বিস্তার, ক্রেতা সংকট, পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অনুকুল আবহাওয়া না থাকা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পাটচাষ হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনে আবারও বদলাতে শুরু করেছে পাটের চাহিদা।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি, সস্তাদামের সিনথেটিক তন্তু ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বাজারে তুলনামূলক ভালো দামের কারণে রাজশাহীর কৃষকদের মধ্যে আবারও পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
রাজশাহীতে তেমন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পাটজাগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন চাষিরা। বৈশ্বিক বৃষ্টিপাতে রাজশাহীর নদী-নালায় পানি জমায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। বর্তমানে মাঠজুড়ে সবুজ পাটগাছের সারি এখন কৃষকের নতুন স্বপ্নের প্রতীক। কোথাও কোথাও আগাম জাতের পাট কাটার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর দুই সপ্তাহের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হবে পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার কাজ।
সোমবার নওহাটা পাট বাজারে সরোজমিন দেখা যায়, নতুন পাট আসতে শুরু করেছে। এদিন প্রতি মণ পাট চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজারে দাম সন্তোষজনক থাকায় আগাম পাট চাষিরা আশাবাদী। অনেক কৃষক মনে করছেন, দাম এভাবেই স্থিতিশীল থাকলে পাট আবারও লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর (প্রায় এক লাখ ৩৭ হাজার বিঘা) জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গতবছর এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে এক হাজার ৯৪ হেক্টর (প্রায় আট হাজার বিঘা)। পাশাপাশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও বেড়েছে। এবারে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি।
সাধারণত চৈত্র ও বৈশাখ মাসে পাটের বীজ বপন করা হয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে আগাম জাতের পাট কাটা শুরু হয়। শ্রাবণ-ভাদ্রজুড়ে চলে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবছর আবহাওয়া অনেকটাই অনুকুল ছিল। ফলে গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো হয়েছে। রোগবালাইও তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
মৌসুমের শুরুটা অবশ্য কৃষকদের জন্য অনুকূলে ছিল না। ফাল্গুন-চৈত্রে বীজ বপনের পর তীব্র খরায় পাট গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। অনেক কৃষককে বাড়তি খরচ করে গভীর নলকূপ থেকে সেচ দিতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল পাট জাগ দেওয়া নিয়ে। আষাঢ় চলে গেলেও রাজশাহীতে এখনো পানির আশঙ্কা কাটেনি। পর্যাপ্ত পানির অভাবে পাট পচালে আঁশের মান নষ্ট হয়ে যায়, রঙ কালচে ও আঁশ শক্ত হয়ে বাজারে আশানুরুপ দাম পাওয়া যায় না। তবে এবার দেশের অন্যান্য স্থানে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় খাল-বিল, নদী-নালা অনেকটা পূর্ণ।
এরপরেও রাজশাহীর পবা, মোহনপুর ও দুর্গাপুরের মতো বিভিন্ন উপজেলায় মাঠের পর মাঠজুড়ে এখন সুস্থ-সবল পাটের সমারোহ। কৃষকরা কোমরপানিতে নেমে পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কঠোর পরিশ্রমে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
প্রতিবছরের মত এবছরও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। পাট জাগ দেওয়ার জন্য পানির সংকট এখনো আছে। বাগমারা উপজেলার কৃষক সাইদুর রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তার ভাষ্য, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার জমির অবস্থা অনেক ভালো। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ সহজ করতে হবে। সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে কৃষকরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।’
এদিকে পবার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিক-সবকিছুর খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা পাট জাগ দেওয়া। কম পানিতে বা দেরিতে জাগ দিলে আঁশের রং নষ্ট হয়। রং খারাপ হলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় না। এত পরিশ্রমের পরও লোকসান হলে আগামী বছর পাটচাষে আগ্রহ হারিয়ে যাবে। আবার তানোর উপজেলার পাটচাষি রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠের পাট দেখে ভালো ফলনের আশা করছি। কিন্তু খাল ও নিচু জায়গায় প্রয়োজনমতো পানি জমেনি। একসঙ্গে সবায় পাট কাটলে জাগ দেওয়ার জায়গা পাওয়া কঠিন হবে। পানি ও শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত খরচ হলে লাভ কমে যাবে। সরকারিভাবে জলাশয় ব্যবহারের ব্যবস্থা না হলে অনেক চাষিকে সমস্যায় পড়তে হবে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এ বছর জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় আবাদ ১ হাজার ৯৪ হেক্টর বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজারদামও কৃষকদের উৎসাহিত করছে। যেসব এলাকায় জাগ দেওয়ার পানির সমস্যা রয়েছে, সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে কম পানি ও জায়গায় পাটের ছাল পচিয়ে উন্নত মানের আঁশ পাওয়া সম্ভব।’
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘পবায় এবার পাটের সার্বিক অবস্থা ভালো। আগাম জাতের পাট অল্প সময়ের মধ্যেই কাটা শুরু হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে ভালো মানের আঁশ পেতে পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত গভীর পানিতে পাট জাগ দেওয়া প্রয়োজন।
পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছর জেলায় তিন লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। গতবছর উৎপাদন হয়েছিল তিন লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। অর্থাৎ এবার ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।


প্রকাশিত: July 17, 2026 | সময়: 4:47 am | সুমন শেখ