, , ।
স্পোর্টস ডেস্ক: ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে রেফারিদের সিদ্ধান্ত কি কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে যাচ্ছে? চলতি বিশ্বকাপে বেশ কয়েকটি ম্যাচে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর এই আলোচনা ফুটবল বিশ্বে চাউর হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার রোমাঞ্চকর ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয়ের পর এই প্রশ্নটি নতুন করে ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ম্যাচ চলাকালীন ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পর্যালোচনার পর মিশরের একটি গোল বাতিল করে দেন মাঠের রেফারি। তার দাবি ছিল, গোলটির বিল্ড-আপে (আক্রমণ তৈরির সময়) একটি ফাউল হয়েছিল। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের দাবি, সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল এবং এটি আর্জেন্টিনার প্রতি রেফারিদের পক্ষপাতিত্বের একটি স্পষ্ট লক্ষণ।
কিন্তু মাঠের আবেগ বাদ দিয়ে যদি আমরা কেবল তথ্য-উপাত্ত আর সংখ্যার দিকে তাকাই, তবে আসল সত্যটা কী? বিশ্বকাপে কি সত্যিই রেফারিদের কোনো পক্ষপাতিত্ব কাজ করে? নর্থইস্টার্ন নেটএসআই স্পোর্ট রিসার্চ গ্রুপের পরিচালক ব্রেনান ক্লেইন মনে করেন, এর উত্তর বেশ জটিল। কেবল ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে, কোনো রেফারি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজ করছেন।
ক্লেইন বলেন, ‘খালি চোখে দেখে হয়তো সহজেই মনে হতে পারে- ‘হায়!! এটা কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত!’ কিন্তু আমি ডেটায় যা দেখি তা হলো-খেলার ঠিক কততম মিনিটে, কোন খেলোয়াড় দ্বারা, মাঠের ঠিক কোন স্থানাঙ্কে (ঢ, ণ কোঅর্ডিনেট) ফাউলটি ঘটেছিল। এর বাইরে কিছু নয়।’
তিনি আরও জানান, পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি গাণিতিকভাবে পরিমাপ করার কোনো উপায় না থাকলেও, এটি খতিয়ে দেখার কিছু বিকল্প পথ রয়েছে। যেমন-গবেষকরা প্রতিটি ম্যাচে ভিএআর হস্তক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ, একটি ম্যাচে কতবার এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কতবার সিদ্ধান্ত কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে গেছে।
চলতি বিশ্বকাপে এই প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছু উল্লেখযোগ্য প্রবণতা দেখা গেছে। ক্লেইনের দেওয়া তথ্যমতে, এই বছরের বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৯৭টি ম্যাচের মধ্যে ৩৫ বার ভিএআর হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এর তুলনায় ২০২২ বিশ্বকাপে ২৬ বার এবং ২০১৮ সালে (যে বছর প্রথম ভিএআর চালু হয়) ২২ বার ভিএআর হস্তক্ষেপ হয়েছিল।
নেটএসআই স্পোর্ট-এর তৈরি করা একটি সাম্প্রতিক চার্টে প্রতি ১০০টি ফাউলের (নিজেদের করা বা প্রতিপক্ষের দ্বারা হওয়া) বিপরীতে কোন দল সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে (নীল রঙে চিহ্নিত) এবং কোন দল সবচেয়ে কম সুবিধা পেয়েছে (লাল রঙে চিহ্নিত) তা দেখানো হয়েছে। (গ্রুপ পর্ব থেকে শেষ ১৬-এর ম্যাচগুলোর ওপর ভিত্তি করে)।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেক্সিকো (৭.৮) এবং আর্জেন্টিনা (৬.৭) সবচেয়ে বেশি ভিএআর সুবিধা পেয়েছে। এই দুই দলই ফাউল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ভিএআর পর্যালোচনার পর নিজেদের পক্ষে ৪টি করে সিদ্ধান্ত পেয়েছে। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, যে চার দল (ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা এবং স্পেন) সেমিফাইনালে উঠেছে, এর মধ্যে ভিএআরের সুবিধা পাওয়া সেরা দশ দলের মধ্যে কেবল আর্জেন্টিনার নামই আছে।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া (৬.৫ বিপক্ষে), ইরান (৫.৪) এবং কাতার (৫.১) সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। ক্রোয়েশিয়া ও প্যারাগুয়ে উভয় দলই নিজেদের বিপক্ষে ৩টি করে ভিএআর সিদ্ধান্ত দেখেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে পক্ষপাতিত্ব মনে হলেও ক্লেইন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ডেটা তা প্রমাণ করে না। এটি কেবল দেখায় যে ভিএআর হস্তক্ষেপগুলো কীভাবে কাজ করেছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকো কেন এই তালিকার শীর্ষে? কারণ মাঠের রেফারিরা এমন কিছু ফাউল মিস করেছিলেন যা ভিএআর প্যানেলের মতে ফাউল হওয়া উচিত ছিল। রেফারিরা সাধারণ ভুল করেছেন বা কিছু ফাউল তাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। তার মানে এই নয় যে তারা সরাসরি পক্ষপাতিত্ব করছেন।’
তবে ক্লেইন এটাও স্বীকার করেছেন যে, মাঠের সাধারণ রেফারিদের এই ভুলগুলো আর্জেন্টিনার পক্ষে যাওয়ার কারণে, আর্জেন্টিনাকে রেফারিরা সুবিধা দিচ্ছে- ফুটবল ভক্তদের মনের এই প্রচলিত ধারণা বা ন্যারেটিভকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন।