সর্বশেষ সংবাদ :

প্রস্তুতি সম্পন্ন, অনুমোদনের অপেক্ষা শুধু : ঊনষাট বছরের নৌ-বাণিজ্যের ইতিহাস ফিরছে সুলতানগঞ্জে

আব্দুল বাতেন: দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর অবশেষে চালুর দ্বারপ্রান্তে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে এখন শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমোদনের অপেক্ষা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অনুমোদন পেলেই শুরু হবে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম।
মঙ্গলবার ১৬ জুন সকাল ১১টায় সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ। ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন। সভায় এনবিআর, বিজিবি, নৌপুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় উপস্থিত প্রায় সব পক্ষই বন্দর চালুর পক্ষে মত দেন। নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে এলাহী বলেন, নৌবন্দর চালু হলে সেখানে নৌপুলিশের থানা স্থাপন করা হবে। বর্তমানে থাকা ফাঁড়িকে থানায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সীমান্তবর্তী এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মাদক চোরাচালানের রুট হিসেবে পরিচিত। তবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে বন্দর চালুর বিষয়ে তারা ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
এনবিআরের প্রতিনিধিরা জানান, বন্দরের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে আগে উদ্বেগ ছিল। বর্তমানে প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
পাথর আমদানিকারক আমিনুল ইসলাম বলেন, সড়কপথের তুলনায় নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক কম। ভারতের মুর্শিদাবাদের মায়া বন্দর থেকে পাথর আমদানি করা গেলে ব্যয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসবে। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পাশাপাশি সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। এ বন্দর দিয়ে শুধু আমদানি নয়, রফতানিও করা যাবে। ফলে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান জানান, বন্দরের সংযোগ সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। এছাড়া বন্দর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে পণ্য সংরক্ষণের জন্য আশপাশের জমি ভাড়া নিতে শুরু করেছেন।
বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, বন্দরের জন্য ২৫ বছরের ইজারায় জমি নেওয়া হয়েছে। নতুন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে পদ্মা নদীর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজিং করা হয়েছে। এখন শুধু এনবিআরের অনুমোদন পেলেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ বলেন, বন্দরটি চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হবে। খুব শিগগিরই এ বন্দর চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এর আগে গত শুক্রবার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন) ও যুগ্ম সচিব সাজেদুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন।
ছয় দশক পর ফিরছে নৌ-বাণিজ্য: প্রায় ছয় দশক আগে রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ান নৌপথে নিয়মিত বাণিজ্য চলত। তবে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে নৌপথটি বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় এ নৌপথে বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ১০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে বন্দরটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়ে পাঁচটি নৌযানে পাথর ও গার্মেন্টসের ঝুট আমদানি-রফতানি করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বন্দরটি পরিদর্শন করে দ্রুত চালুর নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা: গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের মুর্শিদাবাদের মায়া নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। নৌপথটি চালু হলে ভারত থেকে পাথর, মার্বেল, খনিজ বালু, সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানি করা যাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে।


প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬ | সময়: ৪:২১ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর