সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
কালাই প্রতিনিধি: কথা ছিল ঋণের টাকা শোধ করলেই মামলা প্রত্যাহার করে নেবে এনজিও কতৃপক্ষ। এ জন্য খামারীর কাছ থেকে পুরো টাকা পরিশোধ করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঋণ শোধ করার পর এনজিও বলছে, আইনি প্রক্রিয়ায় খামারিকে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এ কারণে ঋণের টাকা শোধ করেও খামারি শামসুর রহমানকে (৭৪) আজও আদালতে উপস্থিত হতে হচ্ছে। ঘটনাটি জয়পুরহাটের কালাই পৌরশহরের পাঁচশিরা বাজার এলাকায় ঘটেছে। শামসুরের বাড়ি পাঁচশিরা বাজারে। হয়রানি থেকে রেহাই পেতে তিনি বিভিন্ন মহলে দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোনো উপকার পাননি।
ভূক্তভোগী শামসুর রহমান জানান, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখা থেকে তাঁর ‘পোলট্টি খামার’ এর ওপর ৩ লাখ টাকা ঋণ নেন। সেই টাকায় ব্রয়লার মুরগীর বাচ্চা ক্রয় করে খামারে লালণ-পালণ করে আসছে। হঠাৎ করে দেশে করোনার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে। গুজব ওঠে ব্রয়লার মুরগি খেলে ক্যান্সার রোগ বেড়ে যাবে। সে কারনে জীবিত দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের মুরগীগুলো মাটি খুরে পুঁতে রাখেন। এতে তিনি আর্থিক ভাবে প্রায় নি:শ্ব হয়ে পড়েন।
তারপরও ঋণের টাকা নেওয়ার পর প্রথম দিকে মাসিক কিস্তি ২৮ হাজার ৫০০ টাকা করে দিলেও পরবর্তীতে তিনি যখন যা পারছেন সেই পরিমান দিয়ে আসছেন।
একপর্যায়ে তিনি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন। বিষয়টি এনজিও কর্তৃপক্ষকে জানালেও তাঁর নামে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মামলা করা হয়। তখন এনজিও’র মোট দাবি ছিল এক লাখ ২২ হাজার টাকা।
খামারি শামসুর রহমান বলেন, মামলার পর এনজিও’র তৎকালিন ক্রেডিট অফিসার অজিত রায় ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার টাকা কিস্তি নিয়ে যায়। ওই বছরের অক্টোবর মাসেও ৫ হাজার টাকা কিস্তি দেন তিনি। এরপর আদালত থেকে মামলার নোটিশ পান। তখন তিনি এনজিও’র ব্যবস্থাপক ও সিও’র সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তখন তারা বলেছিলেন, ঋণ শোধ করলে মামলা প্রত্যাহার করে নেবেন। আর সুদের টাকা মাফ করে দেবেন। এ জন্য তিনি সম্পত্তি বন্ধক রেখে মুল পাওনার টাকা পরিশোধ করেন।
তখন এনজিও ২ লাখ ৮৯৪ টাকার দাবিতে মামলা করেছিল। পরে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর নগদ ৬৫ হাজার এবং সঞ্চয় মিলে তার কাছ থেকে ৭১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়। এনজিও’র ব্যবস্থাপক ওই টাকা আদালতের মাধ্যমে না নিয়ে সরাসরি পাশ বইয়ের মাধ্যমে জমা নেন। কিন্তু এখনো মামলা প্রত্যাহার করেনি। এ কারণে তিনি বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এখন তিনি জয়পুরহাট আদালতে মামলার হাজিরা দিয়ে আসছেন। বাদী পক্ষ আদালতে উপস্থিত না থাকলেও তারিখের দিনে তাকে হাজিরা দিতে হয়। শামসুর রহমান বলেন, এনজিও মামলা প্রত্যাহার করে নিলেই সব মিটে যায়, কিন্তু তারা তা করছেন না। কেন করছেন না তাও তার জানা নেই। মাসের পর মাস তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তাঁর খামার শেষ। এনজিওতে গেলে আগের কর্মকর্তারা নেই বলে আর কেউ ঠিকমত কথাও বলেনা। এমনকি তারা কেউ কিছুই জানেননা বলে অফিস থেকে বের করে দেয়। এখন এ ব্যাপারে দেখারও কেউ নেই।
ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মো. বেলাল হোসেন বলেন, মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাসের ব্যাপারে আমার জানা নেই। আমি সবেমাত্র এখানে যোগদান করেছি। এ সবের কিছুই জানিনা। বিষয়টি এখন আদালতের। আদালতই সমাধান করবেন।
শামসুর রহমান ১৯৭৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। ১৯৯৮ সালে পোলট্টি খামার শুরু করেন। ২০২০ সাল পর্যন্ত তাঁর খামার ভালোই ছিল। ২০২১ সালে ঋণ নেন। পাঁচ মাস কিস্তি দেওয়ার পর তিনি আর নিয়মিত কিস্তি দিতে পারেননি। শামসুর রহমান বলেন, সে সময় করোনার প্রকোপে ব্যবসায় ধস নামে। বিক্রির মহুর্তে জীবিত মুরগী মাটিতে পুতে রাখার কারণে তার সবকিছু শেষ হয়ে যায়। তারপরও মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাসে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে ঋণের পুরো টাকা জমা দিয়েছেন।
আসামী পক্ষের আইনজীবী এ্যাড. লক্ষণ শীল বলেন, ঋণ পরিশোধের কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাদীপক্ষ ঋণের বিপরিতে চেক ডিজঅনার মামলা করেছে। ঋণের টাকা পরিশোধ করে নিলেও তারা চেক ডিজঅনার মামলা প্রত্যাহার করেনি। ঋণের বিপরিতে চেক ডিজঅনার মামলা অন্যায়। আসামীকে হয়রানি করা ছাড়া কিছুই না।
কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম আরা বলেন, খামারি ঋণ শোধ করে দিয়েছেন। তাহলে মামলা প্রত্যাহার হবে না কেন ? এখন আদালতে টাকা জমা দিতে হলে এনজিও’র ব্যবস্থাপক দিক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সমাধান করা হবে।