শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
নুরুজ্জামান,বাঘা :
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে যখন চারদিক মুখর, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে উৎসব উদযাপনে ব্যস্ত মানুষ , তখন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার একটি ভাঙাচোরা মাটির ঘরে নীরবে ঝরেছে এক পরিবারের চোখের পানি। সেখানে উৎসবের আনন্দকে ছাপিয়ে গেছে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য আর জীবন বাঁচানোর আকুতি । এমন একটি পরিবারের নীরব কান্নার গল্প সামনে এনেছেন উপজেলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “ফুড ফর অল’’।
বাঘা উপজেলার জোতজয়রাম গ্রামের বাসিন্দা লালন দীর্ঘদিন ধরে বোনম্যারো ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্ত্রী, দুই শিশু সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। একসময় ভ্যান চালিয়ে পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মরণব্যাধি ক্যান্সার তার কর্মক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। এখন সংসারের চুলা জ্বালানো থেকে শুরু করে চিকিৎসার ব্যয়-সবকিছুই হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্ন।
এ বছর কোরবানীর ঈদের পরদিন কাঁচা মাংস বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে লালনের পরিবারের এই হৃদয়বিদারক বাস্তবতার মুখোমুখি হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ফুড ফর অল’। ঈদ উপলক্ষে সংগঠনটি প্রায় ২০০ অসহায় পরিবারের মাঝে কাঁচা মাংস বিতরণ করছিল। সেই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে লালনের বাড়িতে গিয়ে তাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সংগঠনের সদস্যরা ।
ফুড ফর অল-এর সদস্য রতন বলেন, “লালনের পরিবারের অবস্থা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। চিকিৎসার অভাবে একজন মানুষ ধীরে-ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, আর পরিবারের সদস্যরা অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছেন। পরিস্থিতি দেখে আমরা এতটাই মর্মাহত হয়েছিলাম যে, আমাদের একদিনের রান্না কর্মসূচির জন্য রাখা পুরো মাংসই তাদের পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে দেই।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, লালনের চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়মিত রক্ত পরিবর্তন-সহ ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু অর্থের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না তিনি। ফলে দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে তার শারীরিক অবস্থা। চোখে-মুখে বাঁচার আকুতি নিয়ে লালন বলেন, “আমি বাঁচতে চাই। আমার দুইটা ছোট সন্তান আছে। তাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলেই বুকটা কেঁপে ওঠে।
চিকিৎসকরা বলেছেন, চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু টাকার অভাবে সবকিছু থেমে যাচ্ছে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব।”পরিবার থেকে জানা যায়, লালনের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার জন্য প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা প্রয়োজন। এত বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা তার পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ফুড ফর অল-এর প্রধান কর্ণধার, বিশিষ্ট নাট্যকার, পরিচালক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিমুল সরকার বলেন, “লালনের পরিবারের অসহায়ত্ব আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমরা ভিডিও প্রতিবেদন তৈরি করে বিষয়টি মানুষের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের বিশ্বাস, সমাজের মানবিক ও বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে একজন তরুণ বাবার জীবন বাঁচানো সম্ভব।”তিনি আরও বলেন, “মানুষ মানুষের জন্য-এই চেতনা থেকেই আমরা সবাই যদি সামান্য করে এগিয়ে আসি, তাহলে লালনের চিকিৎসার পথ সহজ হতে পারে। তার দুই শিশুসন্তানের মুখে আবারও হাসি ফিরতে পারে।”
এদিকে লালনের জীবন রক্ষায় এবং তার পরিবারের এই কঠিন সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ‘ফুড ফর অল’। মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় দিন গুনছে অসহায় পরিবারটি। আর দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন লালন।
নুরুজ্জামান /শামি