শনিবার, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সবুজ ইসলাম: নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় চার বছর। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালেও শেষ হয়নি রাজশাহীর শাহমখদুম বিমানবন্দরের শতকোটি টাকার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ। ফলে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরটি এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারছে না। একদিকে যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন টার্মিনাল ভবন ও কার্গো সুবিধা চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বিমান যাতায়াত সহজ করতে ২০২০ সালে শাহমখদুম বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১০৭ কোটি টাকা। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্প ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও এখনও শেষ হয়নি কাজ।
প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের ৬ হাজার ৬০০ ফুট রানওয়েকে ১০ হাজার ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রানওয়ের প্রস্থ ১০০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ১৫০ ফুট করার কথা রয়েছে। এছাড়া অ্যাপ্রোনের আকারও বাড়ানো হচ্ছে, যাতে একসঙ্গে একাধিক উড়োজাহাজ পার্কিং করা যায়। বর্তমানে শাহমখদুম বিমানবন্দরে একই সময়ে একটি উড়োজাহাজের বেশি ওঠানামা বা অবস্থান করতে পারে না। আধুনিকায়ন কাজ শেষ হলে একসঙ্গে তিনটি উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এর মধ্যে যাত্রীবাহী বিমানের পাশাপাশি কার্গো বিমানও পরিচালনা করা যাবে।
এছাড়া বিমানবন্দরে নির্মিত হচ্ছে একটি আধুনিক টার্মিনাল ভবন। দুইতলা বিশিষ্ট এ ভবনের নিচতলার আয়তন হবে ১৭ হাজার বর্গফুট এবং দ্বিতীয় তলার আয়তন হবে ১১ হাজার বর্গফুট। কন্ট্রোল টাওয়ার ও অন্যান্য স্থাপনাসহ পুরো কমপ্লেক্সের আয়তন হবে প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুট। নতুন টার্মিনালে থাকবে আধুনিক চেক-ইন কাউন্টার, প্রশস্ত কনকার্স হল, ডিপারচার ও অ্যারাইভাল লাউঞ্জ, স্ন্যাকস কর্নার এবং ভিআইপি লাউঞ্জ। যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এই নকশায়।
রাজশাহী-ঢাকা রুটে গত কয়েক বছরে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যাত্রীচাহিদা বাড়ার কারণে সরকারি ও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোও ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স মিলিয়ে প্রতিদিন মোট ছয়টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। সপ্তাহে চলাচল করছে চল্লিশর্ধ্বো ফ্লাইট। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চিকিৎসাসেবাগ্রহীতাদের কাছে এই রুটের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে আরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা, বড় আকারের উড়োজাহাজ অবতরণ এবং পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষি উৎপাদনের জন্য পরিচিত রাজশাহী অঞ্চলে আম, লিচু, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে দেশ-বিদেশে। কিন্তু সরাসরি বিমানপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ না থাকায় উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, কার্গো বিমান পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে রাজশাহীর কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানী ও বিদেশি বাজারে পাঠানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকরা ভালো দাম পাবেন এবং রপ্তানি আয়ও বাড়বে। রাজশাহীর ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন শুধু যোগাযোগ খাত নয়, পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
শাহমখদুম বিমানবন্দরের ইতিহাসে একসময় দীর্ঘ স্থবিরতা নেমে এসেছিল। যাত্রীর অভাবে ২০০৭ সালের ২০ জানুয়ারি রাজশাহী-ঢাকা রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রায় আট বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালে পুনরায় এই রুটে ফ্লাইট চালু হয়। এরপর ধীরে ধীরে যাত্রীসংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে এই রুটটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিমান রুট হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এই বিমানবন্দরের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে পূর্বের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
নির্ধারিত সময়ের চার বছর পরও প্রকল্প শেষ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ ৪ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো নিমার্ণ কাজ শেষ না হওয়ায় কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজ ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। ভিতরে জনসাধারণের প্রবেশ না থাকায় অনেক উন্নয়ন কাজে অনিয়ম হচ্ছে। এখানে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারে না। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা জনস্বার্থের পরিপন্থী। দ্রুত কাজ শেষ করে বিমানবন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রকল্প পরিচালক তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক দিলারা পারভীন জানান, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, “বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে। কিছু কারিগরি ও বাস্তব কারণে সময় লেগেছে। আমরা আশা করছি, বর্ধিত মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন হবে।”
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কাজের অপেক্ষায় থাকা রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত আধুনিকায়ন প্রকল্প সম্পন্ন হবে এবং শাহমখদুম বিমানবন্দর একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক বিমানবন্দরে পরিণত হবে। এতে যাত্রীসেবা যেমন উন্নত হবে, তেমনি উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও কৃষিপণ্য রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।