২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের বিপ্লব-পূর্ব পতাকা নিষিদ্ধ করছে ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক: আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরান দল অংশ নিলে স্টেডিয়ামের ভেতরে দেশটির বিপ্লব-পূর্ব যুগের (১৯৭৯ সালের আগের) জাতীয় পতাকা ও সেই প্রতীক সংবলিত পোশাকের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফা।
এর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও এই পতাকা স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। এবার আমেরিকার মাটিতে খেলা হলেও সেই একই নিয়ম বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা। ইরানের বর্তমান অফিশিয়াল পতাকা এবং ১৯৭৯ সালের আগের পুরোনো পতাকার মূল রঙ (সবুজ, সাদা ও লাল) একই।
তবে প্রধান পার্থক্যটি এর মাঝের প্রতীকে। পুরোনো পতাকাটির সাদা অংশের মাঝে একটি ‘সিংহ ও সূর্য’ চিত্রিত রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর তৎকালীন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং থিওক্র্যাটিক (ধর্মতান্ত্রিক) সরকার ব্যবস্থা চালু হলে পতাকা থেকে রাজতন্ত্রের প্রতীক সিংহ ও সূর্য সরিয়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতীক ও ধর্মীয় বাণী যুক্ত করা হয়। তবে দেশের বাইরে থাকা অনেক ইরানি প্রবাসীর কাছে এই পুরোনো পতাকাটি আজও তাদের মূল জাতীয় পরিচয় এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশের অন্যতম বড় মাধ্যম।
যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে, বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশাল সংখ্যক ইরানি প্রবাসী বসবাস করেন। এই অঞ্চলটিকে ভালোবেসে অনেকে ‘তেহরানজেলেস’ বলেও ডাকেন। গ্রুপ পর্বে ইরানের দুটি ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে এবং একটি ম্যাচ সিয়াটলে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইতিমধ্যে ১০ এপ্রিলের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটির ৫০ হাজারেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, যার বড় অংশই কিনেছেন স্থানীয় ইরানি প্রবাসীরা। বর্তমান সরকারের প্রতি প্রবাসীদের ক্ষোভের কারণে স্টেডিয়ামে এই পুরোনো পতাকার ব্যাপক উপস্থিতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
ফিফা সূত্র জানিয়েছে, ইরান ফুটবল ফেডারেশন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে ফিফার কাছে তাদের ‘জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের’ দাবি জানিয়েছিল। এই বিষয়ে ফিফার আচরণবিধির ৩.১.২৪ ধারা উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, স্টেডিয়ামে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, আপত্তিকর বা বৈষম্যমূলক বার্তা, ব্যানার, পোশাক বা প্রতীক প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তবে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ উঠছে কারণ, ফিফা এই বিশ্বকাপে ফিলিস্তিনের পতাকা স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবে। ফিফার যুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা একটি অফিশিয়াল সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদিত পতাকা, যা নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি না হলে কেড়ে নেওয়া যাবে না। অন্যদিকে, ইরানের পুরোনো পতাকাটি কোনো স্বীকৃত ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতীক নয়।
ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো করিম সাদজাদপুর ফিফার এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘লস অ্যাঞ্জেলেসের ইরানিদের স্টেডিয়ামে সিংহ ও সূর্য সংবলিত পতাকা আনতে বাধা দেওয়া আর আমেরিকানদের আমেরিকান স্টেডিয়ামে মার্কিন পতাকা আনতে বাধা দেওয়া একই কথা। এটি স্টেডিয়ামে তীব্র গণ-অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। এই পতাকা ওড়ানো একই সঙ্গে জাতীয় দলের প্রতি সমর্থন এবং বর্তমান ইরান সরকারের বিরুদ্ধে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ।’
এই বিষয়ে মার্কিন হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, তারা মার্কিন সংবিধান ও আইন মেনে স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে।
চোট ও যুদ্ধবিগ্রহের কারণে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও, প্রবাসীদের আবেগের কারণে গ্যালারিতে এই পতাকা বিতর্ক এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে।


প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬ | সময়: ৫:২১ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ