, , ।
মহিদুল ইসলাম, ঈশ্বরদী: দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঈশ্বরদীর নির্মনাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার ২৮ এপ্রিল বিকালে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতর এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
ইউরেনিয়াম বা জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটির কাজ করা হয়েছে। আজ জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের অংশ হলো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ শুধু পাবনা নয়, দেশের অর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।’ আলোচনা শেষে অতিথিরা স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন করেন।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম’ বাংলাদেশে আসে। এতদিন সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত করা ছিল জ্বালানি। মঙ্গলবার যা রিয়েক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রে বসানো হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এই ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর সমৃদ্ধ ধাতব পদার্থটি খনির আকরিক থেকে নানা প্রক্রিয়া করে তৈরি করা এই ইউরেনিয়ামের জ্বালানি যেন দেশ এবং পরিবেশের জন্য কোনো হুমকির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় এর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। এ জন্য ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন ৩ প্লাস রিয়েক্টর স্থাপন করা হয়েছে।
চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানো হলে তা থেকে তাপ তৈরি হবে। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মিত এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম বা জ্বালানি লোডিং শুরু হলো আজ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বলছে, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটি চূড়ান্ত ধাপ। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুতের উৎপাদন শুরু হবে। আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের ২টি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র। জ্বালানি বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠায় বাংলাদেশ। আজ সেই শক্তির ব্যবহার শুরু হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয়েছিল রূপপুরে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রিঅ্যাক্টর ভবন, টারবাইন ভবন, কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং বিভিন্ন সহায়ক স্থাপনাসহ মোট ৩৮৯টি স্থাপনার একটি বিস্তৃত অবকাঠামোর ভৌত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ভৌত নির্মাণ কাজ সমাপ্তির পর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ এর প্রস্তুতি পর্যায় শুরু হচ্ছে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার বৃদ্ধি করা হয় ও নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয় যা স্টেজ ডি ট্রাইয়াল অপশন নামে অভহিত করা হয়। সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাতীয় গ্রীডে ১০০% বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।