নওগাঁ হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ: নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিকে একই ঘটনায় এনসিপির জেলা কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগের বিরুদ্ধে ডিউটিরত নার্সিং কর্মকর্তাদের হেনস্থা, প্রাণ নাশের হুমকি এবং ইন্টার্ন নার্সদের শারিরীকভাবে নির্যাতনের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে।
রোববার বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে শহরের মুক্তির মোড়ে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ তোলে ‘নওগাঁ নাগরিক অধিকার সংগ্রাম পরিষদের’ ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। প্রতিবাদ সমাবেশ এনসিপির জেলা কমিটির সদস্য সচিব খন্দকার তারিকুল ইসলাম, যুগ্ম-আহ্বায়ক দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগ, বাসদের জেলা কমিটির আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল সহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তরা বলেন, গত শুক্রবার ১৭ এপ্রিল সুজন কুমার মন্ডল নামে এক ব্যাক্তি তার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। ভালো চিকিৎসা পাওয়ার আশায় তাকে হাসপাতালের সবচেয়ে ভালো কেবিনে ভর্তি ছিলেন। ভর্তির পরে বলা হয় রুগীকে রক্ত দিতে হবে। সন্ধ্যার আগে রুগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন নার্সদের ডেকে আনলে কেবিনে যে অক্সিজেন লাইন রয়েছে এই অক্সিজেন মাস্ক তারা রুগীকে পরিয়ে দেয়।
অক্সিজেন মাস্ক লাগানোর ১৫-২০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও রুগীর অস্থিরতা কাটে না। তখন রুগীর লোকজন মাস্ক খুলে দেখে সেটিতে কোন অক্সিজেন আসছে না। বিষয়টি নার্সদের জানানোর পরেও তারা গল্প গুজবে মেতে থাকে। এক পর্যায়ে ৪০-৪৫ মিনিট ছটফট করার পরে রুগীর মৃত্যু হয়।
সমাবেশে বক্তারা দাবি জানিয়ে বলেন, অক্সিজেন সংকটের নামে রুগী হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলাকারী এবং দুর্ববহারকারী নার্স ও হাসপাতাল স্টাফদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাসপাতালে বহিরাগত প্রভাব ও দালাল চক্র নির্মূলে ব্যবস্থা নিতে হবে। হাসপাতালকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নওগাঁ জেলা শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগ বলেন, সহযোদ্ধা সুজন কুমার মন্ডলের মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে যাই। সেখানে যাওয়ার পরে একটি ইসিজি করাই। ইসিজিতে মিনিমাম হার্টবিটের একটি অস্তিত্ব পাই। সেখানে একজন পুরুষ নার্স ছিল আমি তখন তাকে বলি ভাই আপনি দ্রুত সময়ের মধ্যে ইমারজেন্সি ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসেন। সে তখন আমাকে বলে আমার ডিউটি ৮তলায় আমি নিচতলায় যাবো না, পারলে আপনারা যান। তখন আমি ওই নার্সকে চড় মারি। চড় খাওয়ার পরে সে ইমারজেন্সি ডক্টরকে ডেকে নিয়ে আসে। জাতির কাছে আমার প্রশ্ন ইমারজেন্সি ডাক্তারকে ডাকা রুগীর লোকজনের দায়িত্ব? নাকি নার্সদের দায়িত্ব। ইমারজেন্সি ডাক্তার রোগীকে দেখার পরে মৃত ঘোষণা করে।
ইমারজেন্সি ডাক্তার এসে তাদেরকে বকাবকি করে। রুগীর এই অবস্থা তোমরা আমাকে কেনো ডাকলা না। তারা এর কোন জবাব দিতে পারে না। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নার্সদের অপসারণ এবং তাদের বিচারের দাবি জানাই।
এদিকে একই ঘটনায় ডিউটিরত নার্সিং কর্মকর্তাদের হেনস্থা ও প্রাণ নাশের হুমকি এবং ইন্টার্ন নার্সদের উপর শারিরীকভাবে নির্যাতনের বিচারের দাবিতে বেলা ১১টার নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনে নার্সিং কর্মকর্তা, ইন্টার্ন নার্স ও ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যানের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আমাদের সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং ইন্টার্ন নার্সরা ডিউটিরত অবস্থায় ছিলেন। রুগীর যা যা চিকিৎসার প্রয়োজন সকল চিকিৎসায় দেওয়ার পরেও রুগীর অবস্থা খারাপ হয় এবং রুগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে এনসিপির নাম ভাঙ্গিয়ে মাহবুব হাসান সোহাগ নামে একজন আমাদের উপর হামলা করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।
আমাদের একজন ইন্টার্ন নার্সের গায়ে হাত তুলে এবং তাকে মারধর করে। আমাদের মেয়ে নার্সদেরকেও মারধর করার জন্য এগিয়ে আসে। বহিরাগত ছেলেপেলে এনে হাসপাতালে সে মব সৃষ্টি করে আমাদেরকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে। আমরা আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছি। আমরা অবিলম্বে এ ঘটনায় সোহাগের বিচার চাই।
মারধরের শিকার ইন্টার্ণ নার্স ইয়ামিন হাসান বলেন, মাগরিবের নামাজ পড়ে উপরে এসে দেখি কেবিনে অনেক হৈচৈ হচ্ছে। সোহাগ নামে একজন এনসিপির প্রভাবশালি নেতা আমাদের সিনিয়র নার্সদের অকথ্য ভাষায় বকাঝকা করছিলেন। এ সময় আমি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হই। তখন তিনি আমাকে হাত ধরে ৮০৮ নম্বর কেবিনে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে যেয়ে আমাকে শারিরীক এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করেন। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
সিনিয়র স্ট্যাফ নার্স শবনম মুস্তারি বলেন, আমাদের সেবার স্থানের সুস্থ একটা পরিবেশ চাই। নিরাপত্তার সাথে আমরা ডিউটি পালন করতে চাই। কেউ আমাদের এসে মারধর করবে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করবে এভাবে তো আমরা সেবা দিতে পারবো না। এই ঘটনার দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার নাহলে আমরা কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হবো।
এ বিষয়ে ২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আ ম আখতারুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে ঘটনার সঠিক কারণ বলা যাবে। তদন্তে কারো বিরুদ্ধে গাফিলতীর প্রমাণ মিললে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


প্রকাশিত: এপ্রিল ২০, ২০২৬ | সময়: ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর