, , ।
রকিবুল হাসান তারেক:
যখন ডিসেম্বর আসে, আমার ভেতরে কী এক তোলপাড় শুরু হয়, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। এই মাসটি ক্যালেন্ডারের নিছক একটি পাতা নয়, এটি আমার অস্তিত্বের গভীরে গেঁথে থাকা এক তীব্র অনুভূতি,ঠিক যেন বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো একটি ব্যথা আর এক ঝলক আলোর দ্যুতি। ১৬ই ডিসেম্বর! নামটি শুনলেই মনটা মুহূর্তে যেন ত্রিশ লক্ষ শহীদের কবরের পাশে নতজানু হয়ে যায়। আমি অনুভব করি, এই মাটির প্রতিটি কণা, এই আকাশের প্রতিটি তারা, এই নদীর প্রতিটি ঢেউ যেন আজও একাত্তরের সেই ভয়ঙ্কর দিনের এবং মহিমান্বিত মুহূর্তটির সাক্ষী হয়ে আছে।
এই বিজয় তো শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্ম নয়, এটি আমার মা-বাবার, আমার পূর্বপুরুষের দীর্ঘশ্বাস আর স্বপ্নের ফসল। যখন ভাবি, কী প্রচণ্ড সাহস নিয়ে একটি নিরস্ত্র জাতি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তখন আমার শিরদাঁড়া দিয়ে এক বিদ্যুতের স্রোত বয়ে যায়। এই সংগ্রাম তো শুরু হয়েছিল আরও আগে, সেই ৫২’র ফাগুনে, যখন ভাষা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। মায়ের মুখের ভাষা রক্ষার সেই জেদই তো আমাদের শিখিয়েছিল, অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয়। আর সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয় ছিল প্রথম গণতান্ত্রিক হাঁক, যা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তারা বুঝতে পারেনি, বাঙালি একবার জেগে উঠলে তাকে দমিয়ে রাখা যায় না। সেই ১৯৫৪ সালের নির্বাচন বাতিল করে তারা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, কেবল ব্যালট নয়, বুলেটই শেষ কথা বলবে। আর সেই বুলেটের জবাব দিতেই মুক্তিযোদ্ধারা বজ্রকণ্ঠে ডাক দিয়েছিলেন মুক্তির!
মার্চের সেই ভয়াল রাত! ২৫শে মার্চের কথা মনে পড়লে আজও যেন আমার কানে ভেসে আসে গণহত্যার বীভৎস চিৎকার। আমি অনুভব করি, ঘুমন্ত ঢাকার বুকে নেমে আসা ট্যাঙ্কের কর্কশ আওয়াজ। আমার মনে হয়, আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই পোড়া ঘরের সামনে, যেখানে স্বপ্নগুলো নিভে গিয়েছিল এক লহমায়। কিন্তু ঐ রাতেই বাঙালি শিখেছিল মরতে, আর মরেও অমর হতে।
এরপর শুরু হলো সেই জনযুদ্ধ, যেখানে কোনো পেশা, ধর্ম বা শ্রেণি ছিল না,ছিল শুধু এক পরিচয়: মুক্তিযোদ্ধা। একটা কৃষক তার লাঙল ফেলে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, একজন শিক্ষক ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন গেরিলা দল। আমার দেশের বীরাঙ্গনারা, যারা সবটুকু বিলিয়ে দিয়েও শেষ মুহূর্তে জন্মভূমিকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন,তাদের ত্যাগের কাছে কি এই জাতি চিরকাল ঋণী নয়? যখন আমি বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা দেখি, তখন সেই পতাকার লালে আমি দেখি ত্রিশ লক্ষ শহীদের জমাট বাঁধা রক্ত আর সব হারানো মা-বোনের অশ্রু। আর সবুজে দেখি সেই অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাকে, যা ছিল তাদের শেষ স্বপ্ন।
ডিসেম্বর মাস যখন ঘনিয়ে আসে, প্রতি মুহূর্তে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। চূড়ান্ত বিজয়ের আগে ডিসেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহ ছিল যেন এক প্রচণ্ড টর্নেডোর গর্জন। যখন রেডিওতে খবর আসত, এই এলাকা মুক্ত হয়েছে, ওই ঘাঁটির পতন হয়েছে, তখন বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দের অশ্রু ঝরত। অবশেষে এল সেই ১৬ই ডিসেম্বর, সমগ্র জাতির প্রতীক্ষার অবসান। রেসকোর্স ময়দানে যখন আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হলো, তখন মনে হয়েছিল যেন কয়েক হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সেই মুহূর্তের উল্লাস, মানুষের বাঁধভাঙা আনন্দ, আকাশ-বাতাস কাঁপানো জয়ধ্বনি, সে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি, যা ইতিহাস বইয়ের পাতায় ধরে রাখা যায় না, তা হৃদয়ের গভীরেই অনুভব করতে হয়।
তবে, এই বিজয়ের উল্লাসের আড়ালে আজও জমে আছে এক গভীর ক্ষত, এক চাপা কষ্ট।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। আজ যখন আমি আমার বাংলাদেশকে দেখি, তখন আশার আলো ঝলমল করে, আবার হতাশার কালো মেঘও জমে। আমাদের বিজয়ের প্রধানতম আশা ছিল একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ। আমরা চেয়েছিলাম, স্বাধীনতার সূর্য যেন কেবল ধনীর ঘরের জানালায় নয়, শ্রমজীবী মানুষের কুঁড়েঘরেও আলো দেয়। কিন্তু আজ যখন দেখি, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আকাশচুম্বী, যখন দেখি সুশাসনের অভাব আর নৈতিকতার পতন, তখন বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, যেসব স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমার ভাইয়েরা জীবন দিয়েছিল, আমরা কি তাদের সেই স্বপ্নকে পুরোপুরি মর্যাদা দিতে পেরেছি? এই হলো আমাদের বিজয়ের হতাশার দিক।
আজও যখন দেখি, রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা হয়, তখন মনে হয় আমাদের সংগ্রাম বুঝি আজও শেষ হয়নি। যে অসাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম, সেই চেতনা মাঝে মাঝে আক্রান্ত হয়। গণতন্ত্রের পথে হাঁটার স্বপ্ন অনেক সময় হোঁচট খায়। আমার এই হতাশা কিন্তু একধরনের অভিযোগ নয়, এটি এক গভীর প্রেমিকের অভিমান। কারণ আমি দেশকে ভালোবাসি, তাই দেশের ভুলত্রুটিগুলো আমাকে আরও বেশি কাঁদায়।
তবুও, এই সব হতাশার মেঘ ভেদ করে ঝলমল করে ওঠে আশার সূর্য। এই দেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যায়, যখন বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে, যখন আমাদের তরুণ প্রজন্মের সম্ভবনা যখন বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত, তখন মনে হয়, আমাদের রক্তদান বৃথা যায়নি। তখন মনে হয় একাত্তরের সেই অদম্য সাহস আজও আমাদের শিরায় শিরায় বহমান। এই অর্জনগুলোই আমাদের হৃদয়ে নতুন করে জ্বালিয়ে দেয় এই বিশ্বাস “আমরা পারব” । আমাদের এই সংগ্রাম এখন পরিবর্তিত হয়েছে: এখনকার সংগ্রাম হলো দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।
১৬ই ডিসেম্বর তাই আমার কাছে কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়। এটি আমার হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত এক আয়না। এই আয়নায় আমি দেখি আমার জাতির অতীত গৌরব, আর দেখি বর্তমানের চ্যালেঞ্জ। এটি আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধ কোনো বইয়ের পুরোনো গল্প নয়, এটি একটি জীবন্ত অঙ্গীকার। আমাদের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, হাতে হাত রেখে সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, যেখানে প্রতিটি মানুষ মাথা উঁচু করে বলতে পারবে “আমি স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক।”
লেখক :
মো: রকিবুল হাসান তারেক
ছাত্র
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়