সর্বশেষ সংবাদ :

বিএনপির দুঃসময়ে দলের কাণ্ডারি ছিলেন মিজান, সুসময়ে বহিস্কার

টিপু সুলতান, তানোর: নাম মিজানুর রহমান মিজান। লেখা-পড়া করেছেন কলকাতা থেকে। তার মামা সাবেক তানোর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপির নেতা মরহুম এমরান আলী মোল্লা হাত ধরে বিএনপির রাজনীতি শুরু।
ছাত্রদল, যুবদল তানোর থানা সভাপতি ও বিএনপির তানোর উপজেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০১৫ সালে বিএনপির দলীয় মনোনিত প্রাথী হিসাবে নেতা-কর্মী ও ভোটারদের জনপ্রিয়তার শীর্ষে তানোর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। তানোর পৌরসভার মেয়রের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে যাবার সময় রাস্তায় মিজানকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠায়।
আওয়ামী লীগ শাসন আমলে ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালে আগস্ট মাস পর্যন্ত বহুবার তিনি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় জেল হাজতে যান। আওয়ামী লীগ শাসন আমলে হাতেগুনা কয়েকজন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিএনপির রাজনীতির মাঠ চাঙ্গা করতে প্রশাসনের অনেক বাধা উপেক্ষা করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন।
কোটা আন্দোলনের সময় সবশেষে ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে গিয়ে পুলিশ মিজানকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠান। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিজান জেল থেকে বের হয়ে তানোর উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করেছেন।
রাজশাহী- ১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব:) শরিফ উদ্দীনের কথা মতো মিজান তানোর উপজেলা বিএনপির সকল নেতা-কর্মীদের এক কাতারে করে দলীয় কার্যক্রম সুষ্ঠ ভাবে পরিচালনা করছিলেন। এরি মধ্যে ঘটে যায় পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপির দুই গ্রুপের সংর্ঘষ। এতে মারা যান এক জন। বিএনপির গুটি কয়েক ব্যক্তি সেই হত্যা মামলায় মিজানকে ষড়যন্তমূলক আসামী করে দল থেকে বহিস্কার করান।
দলীয় সূত্র জানায়, গত রমজানে পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার মাহফিলে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিজান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিনকে বরণ করাকে কেন্দ্র করে ইউপি বিএনপির সাবেক চেয়ারম্যান মমিনুল হক মমিন ও পাচন্দর ইউপি বিএনপির সভাপতি প্রভাষক মজিবুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে মমিনের ভাই বিএনপি কর্মী গানিউল আহত হয়ে পরে মারা যান।
এ ঘটনায় মিজান, মজিবুর সহ তাদের অনুসারীদের নামে মামলা হয়। যদিও মিজান মারপিটের পর সরাসরি মঞ্চে চলে যান। সেখানে তিনি অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, তবুও তাকে মামলায় আসামি করা হয়। এরপর কেন্দ্রীয় নির্দেশে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি সদস্য পদ থেকে মিজানকে এবং পাঁচন্দর ইউপি বিএনপির সভাপতি মজিবুরকে বহিষ্কার করা হয়।
তানোর থানা ছাত্র দলের আহবায়ক মাসুদ করিম বলেন, আওয়ামী লীগ শাসন আমলে বিএনপির দুঃসময়ে মিজান অনেক ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করেছেন। যখন দলের সুদিন আসলো তখন মিজানকে মিথ্যা মামলা দিয়ে দলের সদস্য পদ থেকে বহিস্কার করে রাজনৈতিক ভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে। মিজানকে বহিস্কার করার পর থেকে তানোর বিএনপি ঝিমিয়ে পড়েছে।
বিকল্প নেতৃত্ব বিএনপিতে স্থবিরতা কাটাতে তানোর পৌরসভার সাবেক মেয়র মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন উপজেলা বিএনপি ও অংগ সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৯০ ভাগ নেতা কর্মী ও সমর্থকরা।
তালন্দ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান নান্নু বলেন, মিজানের শূন্যতা পুরন করতে কোন নেতা নেতৃত্ব দিয়ে সভা সমাবেশ ও দলীয় কোন কর্মকান্ড করতে পারেনী। ফলে, মিজানকে নিয়েই বিএনপির রাজনীতি করতে চাচ্ছে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা কর্মী ও সমর্থকরা।
তানোর উপজেলা বিএনপির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় পর থেকেই এ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দুই ঈদ পার হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সভা সমাবেশ কিংবা সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখা যায়নি। গত জুনের ২১ তারিখে তানোর উপজেলা মিলনায়তনে এক দিনের পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা ও মিজানের নেতৃত্বেই। সেখানে তানোর উপজেলার সকল ওয়ার্ডের বিএনপির ও অংশ সহযোগী সংগঠনের সভাপতি, সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সবারই একই দাবি মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরে গেলেও মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি।
ফলে, দীর্ঘ দিন ধরে দলীয় কর্মকান্ড বন্ধ থাকার কারণে তানোর বিএনপি ভেতরে ভেতরে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি ও স্থবিরতার মূলে মিজানের বহিষ্কারাদেশকেই দায়ী করছেন। বিষয়টি তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দ্রুত মিজানের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তার সম্মান তাকে ফিরিয়ে দেবার দাবি জানাচ্ছি।
তানোর পৌর যুবদলের যুগ্ম-আহবায়ক শরিয়তুল্লা বলেন, মিজানকে বহিস্কার করার পর নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসচ্ছে তানোর বিএনপি ততই ঝিমিয়ে পড়ছে। মিজান ছাড়া তানোর উপজেলার রাজনীতি চাঙ্গা হবে না। মিজান দল থেকে বহিস্কার হবার পরও তানোর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌর সভার ৯০ ভাগ নেতা-কর্মী তার পক্ষে রয়েছে।
মিজানের দলে বহিস্কার আদেশ থাকার কারণে অনেক দলীয় প্রোগ্রাম সঠিক ভাবে পালিত হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ শাসন আমলে মিজান অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার পরও হাল ছাড়েনি। সে পিছু হিেটেন। আমাদেরকে সব সময় উৎসাহিত করে দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। আমি কেন্দ্রের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি মিজানের বহিস্কার আদের্শ প্রত্যাহার করুন। তানোর বিএনপি আবারও চাঙ্গা হয়ে যাবে।
তানোর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুব মোল্লা বলেন, বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মতে, ‘তানোর বিএনপি মানেই মিজান।’ তাঁর উপস্থিতি নেতাকর্মীদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরিয়ে আনে। তাই তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতি দাবি উঠেছে, মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দলকে দ্রুত সুসংগঠিত করতে হবে।
তাঁদের মতে, মিজান ছাড়া তানোরে বিএনপি কার্যকর কোনো অবস্থানে যেতে পারবে না। তানোরের সাতটি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার নেতাকর্মীরা একাধিক সভা করে মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
চাঁন্দুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আজাদ ও সম্পাদক সাজ্জাদ বলেন, মিজান তানোর বিএনপির বটবৃক্ষ। তাঁর ছায়াতলে সবাই রাজনীতি করতে চান। অথচ তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
তানোর পৌরসভার ৬নং ওয়াড বিএনপির সভাপতি ওবাইদুর মোল্ল্া বলেন, মিজান আওয়ামী লীগ শাসন আমলে আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নেতা। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করেছেন। মিজান ছাড়া তানোর বিএনপি কার্যত অচল। বিভক্ত বিএনপিকে এক কাতারে আনতে মিজান ছাড়া অন্য কাউকে যোগ্য মনে করছেন না তৃণমূল ও সিনিয়র নেতারা।
মুন্ডুমালা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কবির বলেন, বিএনপির আওয়ামী লীগ শাসন আমলে তৎকালিন এমপি বলেছিলেন মিজানকে তার সঙ্গে থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে। কিন্তু মিজান বিএনপি আদর্শকে সম্মান জানিয়ে বিএনপির রাজনীতি আকড়ে ধরে রেখেছিলেন। যার কারণে মিজানের নিজের ডিসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোর পূর্বক দখল করে নেয় আওয়ামী লীগ লোকজন। বিএনপির দূর সময়ে লড়াকো সৈনিক মিজানুর রহমান মিজানের তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি।
তানোর থানা যুবদলের সদস্য সচিব শরিফ উদ্দীন মুন্সী বলেন, মিজান তানোর বিএনপির ‘আইকন’। তিনি ছাড়া দলে ঐক্য ফিরবে না। আগাম নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দলকে সু-সংগঠিত করতে হলে কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটিকে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।
তানোর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আখেরুজ্জামান হান্নান বলেন, আওয়ামী লীগ শাসন আমলে মিজানের নেতৃত্বে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। তাই দলে ঐক্য ফেরাতে তাঁর ফিরে আসা জরুরি। আমি কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে উদাত্ত আহবান রাখছি মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।


প্রকাশিত: August 4, 2025 | সময়: 3:27 am | সুমন শেখ

আরও খবর