, , ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: আট বছর ধরে অপেক্ষা ছিল সন্তানের জন্য। সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত এসেছিল ঠিকই। তবে সন্তানের মুখ দেখা হয়নি বাবা মিনারুল ইসলামের। গত বছরের ২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রাজশাহীর গুড়িপাড়া-পুরাপাড়া এলাকার মিনারুল ইসলাম (২৭)। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিক।
সেদিন আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন মিনারুল। সহযোদ্ধারা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। স্ত্রী নূরেসান খাতুন তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেও দুই মাস ৯ দিন পর তাঁর কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে পুত্রসন্তান। বাবার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে শিশুটির নাম রাখা হয় মিনহাজুল ইসলাম সাইফান। এখন তার বয়স ৯ মাস।
নিহত মিনারুলের পরিবারে রয়েছেন মা ডলি বেগম এবং দুই ভাই অটোরিকশাচালক সোহেল ও নাজমুল হক। পরিবার জানায়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার কিছুক্ষণ পর মিনারুলের নম্বর থেকেই ফোন আসে। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে সবাই। পরদিন বাড়িতে মরদেহ এলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজব আলী পরিবারকে চাপ দেন-মৃত্যুর কারণ যেন সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। সেই চাপের মুখে তখন দাফন সম্পন্ন হলেও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩ সেপ্টেম্বর নিহতের ভাই নাজমুল হক সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন।
ওই মামলায় চলতি বছরের ৮ মে গ্রেপ্তার হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।
স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানকে নিয়ে নূরেসান খাতুন আশ্রয় নিয়েছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ফরাদপুরে নিজের বাবার বাড়িতে। দিনমজুর বাবা সাইদুলের আয়ে কোনো রকমে চলে সংসার। ফরাদপুরে কথা হলে নূরেসান খাতুন শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্বামী বেঁচে থাকলে ছেলেটার ভবিষ্যৎ হয়তো আলাদা হতো। এখন ওকেই আঁকড়ে বেঁচে আছি। বাবার বাড়িতে থাকি, বাবাও দিনমজুর। অনেক কষ্টে দিন চলে। সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই-আমার ছেলেটাকে অন্তত মানুষ করতে পারি। পাশাপাশি স্বামীর হত্যার বিচার চাই, আর দেরি যেন না হয়।’
নূরেসানের বাবা সাইদুল বলেন, ‘মেয়ের জামাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নাতিটা প্রায়ই অসুস্থ থাকে, ভালো চিকিৎসাও করাতে পারি না। সরকার যেটুকু সাহায্য দিয়েছে, তার একাংশ মিনারুলের মা পেয়েছেন, বাকিটা নাতির জন্য তুলে রেখেছি। এতিম শিশুটার যেন ভবিষ্যৎ অন্ধকারে না ডুবে যায়, এইটাই চাই।’
নূরেসানের মা নূরমহল বেগম বলেন, ‘মেয়ের জামাইয়ের বুকে গুলি লেগেছে, আমার বুকেও লেগেছে। বিনা দোষে ওকে গুলি করে কেড়ে নেওয়া হলো। আজও বিচার পাইনি। আমরা শেখ হাসিনার বিচার চাই।’
গত ১৮ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান রাজশাহীর কর্মী সম্মেলনে অংশ নিতে এসে ফরাদপুরে এই শহীদ পরিবারের খোঁজ নিতে যান। তিনি সাইফানকে কোলে তুলে নিয়ে বলেন, ‘তুমি আমার নাতি, আর তোমার মা আমার মেয়ে।’
পরে জনসভায় শহীদ মিনারুলের ত্যাগের কথা স্মরণ করে আবেগঘন ভাষায় বলেন, ‘এই রক্ত বৃথা যাবে না।’