সর্বশেষ সংবাদ :

ইজারাদার ও চরবাসীর মধ্যে উত্তেজনা, নৌকা চলাচল বন্ধ

স্টাফ রিপোর্টার, গোদাগাড়ী: রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। সেই খেয়াঘাট ইজারাদাররা আদায় করেন অতিরিক্ত টোল। ইজারাদারদের সন্ত্রাস ও অনিয়মের বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েছিল চরের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।
এ অবস্থায় শনিবার চরবাসী একত্রিত হয়ে ইজারাদারকে বিতাড়িত করেছেন। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে টোল আদায় ঘর। চরবাসীর দাবি, খেয়াঘাট ইজারা দেওয়ার নিয়মই এখন বাতিল করতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারাদাররা দীর্ঘদিন ধরে নৌঘাটকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করে আসছেন। প্রতিবছর যিনি ইজারা নেন, তিনি নিজের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করেন; কোনো নির্দিষ্ট চার্ট বা সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। স্থানীয়দের ভাষায়, ঘাটে টোল নয়, যেন সন্ত্রাসীদের হাতে কর দিচ্ছেন তারা। ঘাট ঘিরে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য চক্র, যারা চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও মারধরকে নিয়মে পরিণত করেছে। প্রতিবাদ করলে হামলা এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও রয়েছে।
জেলা পরিষদ এই ঘাট ইজারা দেয়। শর্ত রয়েছে, ৫ টাকায় ইজারাদার মানুষকে পদ্মা নদী পার করে দেবেন। কিন্তু কোনদিনই এই শর্ত তারা মানেন না। ঘাটের জন্য নেওয়া হয় আলাদা টাকা, আবার নৌকার জন্যও নেয়া হয় আলাদা ভাড়া। ফলে নদী পার হতে গুণতে হয় কমপক্ষে ৩০ টাকা। মালামাল থাকলে আদায় করা হয় ইচ্ছেমতো টাকা। আওয়ামী সরকারের পতনের পর চরবাসী এর প্রতিবাদ করে আসছেন। এ নিয়ে ইজারাদারদের সাথে দেখা দিয়েছে বিরোধ।
বিরোধ মেটাতে ও যৌক্তিক টোল নির্ধারণে শুক্রবার জেলা পরিষদ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা পুলিশ নিয়ে খেয়াঘাটে যান। তারা উভয়পক্ষের সাথে কথা বলেন। নতুন ভাড়া নির্ধারণের ব্যাপারে উভয়পক্ষকে আশ্বস্ত করা হয়৷ তবে শনিবার বিতাড়িত করা হয়েছে ইজারাদারকে।
শনিবার সকাল থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকশো মানুষ লাঠিশোটা নিয়ে ফেরিঘাটে আসেন। তাদের অভিযোগ, সকালে ইজারাদারের সশস্ত্র লোকজন মাঝিদের নৌকা চলাচল বন্ধ করতে বাধ্য করে এবং হুমকি দেন যে, ‘নৌকা চালালে নদীতে কেটে ফেলে দেবো।’ আতঙ্কে মাঝিরা নৌকা চালানো বন্ধ করে দেন। এতে চরবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে মসজিদের মাইকিংয়ের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশো মানুষ উত্তেজিত হয়ে নদীর পাড়ে জড়ো হন এবং ঘাট এলাকায় অবস্থান নেন।
এর আগে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে পড়লে সকাল থেকেই প্রায় ৭০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা থমকে যায়। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, রোগীদের শহরে চিকিৎসা নেওয়া, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের সীমান্ত লাগোয়া চরটিতে নেমে আসে মানবিক বিপর্যয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা পড়েন চরম সংকটে।
বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশান বলেন, ‘জরুরি কাজে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু এসে দেখি ঘাট বন্ধ। যারা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, তাদের অস্ত্রের মুখে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। হুমকি দেওয়া হয়েছে, পার হলে মেরে ফেলা হবে।’
চরবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও ইজারাদারদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান না। তারা নীরব সমর্থন দিয়ে থাকেন। বারবার জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদে অভিযোগ জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের নীরবতায় ইজারাদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ তাদের।
চরের বাসিন্দা একরাম বলেন, ‘আমরা গরিব, গলার জোর নেই, টাকা নেই। আমাদের কথা কেউ শোনে না। ওদের টাকা আছে, পেশীশক্তি আছে, তাই প্রশাসন চুপ। আর সহ্য করা যাবে না। এবার যদি প্রশাসন ব্যবস্থা না নেয়, আমরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।’
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, উত্তপ্ত এই পরিস্থিতি যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের দিকে মোড় নিতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে ইজারাদার হামিদুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। স্থানীয় লাইনম্যানদের সঙ্গে কিছু তর্কবিতর্ক হয়েছিল, সেটা আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।’
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা হাসান বলেন, ‘পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমি নিজে গিয়েছিলাম। উভয়পক্ষের জন্য যৌক্তিক টোল নির্ধারণ করা হবে বলেছিলাম। আজ নৌকা নাকি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তখন টোল আদায়ের ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। চরবাসীর এখন এক দাবি- এখানে আর ইজারাদারের মাধ্যমে যেন নদী পারাপারে টোল আদায় করা না হয়। সেই সিদ্ধান্ত তো আমরা দিতে পারি না। এটা শুধু মন্ত্রণালয় পারে। আমরা মন্ত্রণালয়ে জানাব।’


প্রকাশিত: April 27, 2025 | সময়: 4:30 am | সুমন শেখ