বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মাহফুজুর রহমান প্রিন্স, বাগমারা: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। এতে জনমনে চরম উদ্বেগ বেড়ে গেছে। এসব ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণে উপজেলার ঝিকরা এলাকায় মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে জোড়া খুন, ভবানীগঞ্জ বাজারে ব্যবসায়ীর দেড়লক্ষ টাকা ও ১৮টি মোবাইল ফোন ছিনতাই, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল ও ভ্যান চুরি সহ প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, চুরি, মাদকের বিস্তার, হামলা, ভাংচুর, সংঘর্ষ, জমি দখল, কিশোর অপরাধ, অবৈধ পুকুর খনন সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। এতে জনমনে চরম আতংক ও উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।
বাগমারা থানার দেওয়া তথ্য মতে, গত শুক্রবার বিকেলে উপজেলা ঝিকরা ইউনিয়নের রনসিবাড়ি বাজারে মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে মাদকাসক্ত আমিনুল ইসলাম নামে এক ব্যাক্তি মাছ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাকে কুপিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনার জের ধরে ওই সময় গ্রামবাসীরা হত্যাকারি মাদকাসক্ত আমিনুলকে ধাওয়া করে গণপিটুনি দিয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। এভাবে মব সৃষ্টি করে গণপিটুনির নামে মানুষ হত্যা করায় এলাকাবাসীর মাঝে আরো উদ্বেগ উৎকন্ঠা বেড়ে গেছে।
সচেতন গ্রামবাসীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার কারণে এবং সঠিক বিচার না পাওয়ায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এভাবে গণপিটুনির নামে মানুষ হত্যা করার ফলে ঘটনার মূল মোটিভ অনেক সময় উৎঘটিত হচ্ছে না। ফলে অপরাধি পার পাওয়ার আশংকা থেকে যাচ্ছে। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরের দিন বাগমারা থানায় দুইটি মামলা দায়ের হলেও কোন আসামী গ্রেপ্তার হয়নি।
একই দিন রাত নয়টার দিকে ভবানীগঞ্জ বাজারের শাহিন টেলিকমের ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় উপজেলা মেইন গেটের সামনে থেকে মোটরসাইকেল সহ দুই ছিনতাইকারি দেড়লক্ষ টাকা ও আঠারোটি মোবাইল সহ ব্যাগ ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কথিত দুই ছিনতাইকারিকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করলেও উদ্ধার হয়নি টাকা ও মোবাইল।
আবার একই দিন দুপুরে বাগমারা প্রেসক্লাবের সভাপতি রাশেদুল হক ফিরোজের এ্যাপাচি মোটরসাইকেল হামিরকুৎসা বাজার থেকে অতি সুকৌশলে নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ চোরের দল। ওই সময় ফিরোজ তার মোটরসাইকেল বাড়ি সংলগ্ন হামিরকুৎসা বাজারের মসজিদের সামনে রেখে জুম্মার নামাজ আদায় করতে মুসজিদে ঢুকে। পরে নামাজ শেষে বাইরে এসে দেখে তার মোটরসাইকেলটি চুরি করে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ চোরের দল। এই ঘটনায় বেশ কয়েটি ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করা গেলেও চোর সনাক্ত বা মোটরসাইকেল উদ্ধারে কোনই অগ্রগতি হয়নি।
এর এক সপ্তাহ আগে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে আইন শৃঙ্খলা কমিটির মিটিং চলাকালিন সময়ে খাঁপুর দালিখ মাদ্রাসার সুপরেনটেনডেস্ট আব্দুল আজিজের সিটি বাজাজ মোটরসাইকেল চুরি করে নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ চোরের দল। এই ঘটনায় ইউএনওর সিসি ক্যামেরায় চুরির দৃশ্যটি দেখা গেলেও আজো চোর সনাক্ত ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
এর আগে বাগমারায় ১২ বছরের কন্যা শিশুকে যৌন নিপিড়নের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার রাতে থানায় মামলা দায়েরের পর গত বুধবার সকালে আসামীকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে জনতা তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার বিকেলে ১২ বছরের এক কন্যা শিশু উপজেলার নরদাশ ইউনিয়নের একটি গ্রামের বাসিন্দা ইয়াদ আলীর বাড়িতে মই আনতে যায়। এসময় বাড়িতে কেউ না থাকার সুবাদে ইয়াদ আলী (৫০) নামের এক ব্যক্তি ওই শিশুর আপত্তিকর স্থানে হাত দেওয়া ছাড়াও যৌন নিপিড়ন করেন। শিশুর চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে ইয়াদ আলীকে আটক করে। এসময় তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। ভবিষ্যতে এমন কর্মকান্ডে জড়াবেন না বলে জানান।
পরে লোকজন তাকে স্থানীয় হাটগাঙ্গোপাড়া তদন্তকেন্দ্রের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। সন্ধ্যায় বাগমারা থানায় হস্তান্তর করা হয়। রাতে শিশুর বাবা মেয়েকে যৌন হয়রানির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, গ্রেপ্তার ইয়াদ আলীর বিরুদ্ধে এর আগেও নারীদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। গ্রাম্য শালিসে তাকে সর্তক করা হয়েছিল।
এর আগে বাগমারায় পারিবারিক কলহের জেরে রশিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার স্ত্রী মুখে এসিড জাতীয় তরল রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওই গৃহবধূকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার নরদাশ ইউনিয়নের চন্ডীপুর গ্রামে।
ভুক্তভোগী নারীর নাম আসমানি খাতুন (২৮)। এ ঘটনার পর থেকে স্বামী রশিদুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, দুই বছর আগে আসমানির সঙ্গে প্রতিবেশী রশিদুলের বিয়ে হয়। এটি তাদের দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়েল পর রশিদুল ইসলাম স্ত্রী আসমানীকে নিয়ে বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে কাজের সুবাদে রাজশাহী শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন। ওই বাসাভাড়ার টাকা চাওয়াকে কন্দ্রে করে স্বামী আসমানীর সাথে রশিদুল ইসলামের বাকবিতান্ডা হয়।
বাকবিতান্ডার জেরে স্বামী রশিদুল ইসলাম ৬ মার্চ রোববার দিবাগত গভীর ঘরের দরজা বন্ধ করে ‘ড্যামফিক্স’ নামের এসিড জাতীয় তরল রাসায়নিক পদার্থ ঘুমান্ত স্ত্রী আসমানীর মুখে ঢেলে দেন। আসমানীর ছটপটি ও চিৎকারে বাড়ির লোকজন জেগে উঠে। সেখান দ্রুত পালিয়ে যান স্বামী রশিদুল ইসলাম।
পরিবারের লোকজন রতেই অসুস্থ আসমানিকে প্রথমে বাগমারা ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে করেন। আসমানীর মা মালেকা বিবি জানান, ‘আসমানির গালের ডান পাশ ও জিহ্বা পুড়ে গেছে। তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।’
এসব ছাড়াও বাগমারায় বর্তমানে মাদকের বিস্তার, কিশোর আপরাধ ও মোবাইল ফোনে অনলাইন জুয়া ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। গত ১০-১২ দিনে বাগমারা থানা পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রন দপ্তর অভিযান চালিয়ে গাঁজা ইয়াবা ও চোলাই মদ সহ পনের জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তারপরও থামছে না মাদকের বিস্তার। ভবনাীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারি অধ্যাপক রিনা ইসলাম জানান, এখন কোন রাজনৈতিক দল পাওয়ারে নেই তার পরও কেন প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না এটা উদ্বেগজনক বিষয়।
এই উপজেলায় এখন অবৈধ পুকুর খনন মাহমারি রুপ ধারন করেছে। এর ফলে কৃষকের জমি দখল, মারামারি, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের মত একাধিক ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ জন্য আদালতে একাধিক মামলা ও মহামান্য হাইকোর্টর লিগ্যাল নোটিশ জারি করা হলেও বন্ধ হয়নি অবৈধ পুকুর খনন। এখন রাত করে চলছে পুকুর খননের মহৎসব। বর্তমানে গনিপুর, বাসুপাড়া ও গোবিন্দপাড়ায় চলছে অবৈধ পুকুর খনন। কেবল গোবিন্দপাড়াতেই ৫-৬ টি পয়েন্টে রাতের আঁধারে চলছে পুকুর খনন।
এদিকে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গনিপুর ইউপির চেয়ারম্যান এ্যাড. মনিরুজ্জামান রঞ্জু ও হাইকোর্টের আইনজীবি বাগমারার বাসিন্দ ব্যারিস্টার সালেকুজ্জামান সাগর অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি বাগমারায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়তই হত্যা, চাঁদাবাজি, দখল বানিজ্য সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে।
বিশেষ করে অবৈধ পুকুর খনন এই আইন শৃঙ্খলার অবনতিকে আরো উসকে দিচ্ছে। তিনি নিজে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিটপিটিশন দায়ের করলে আদালত তা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও তা স্থানীয় প্রশাসনের গাফলতির কারণে ভেস্তে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ব্যারিস্টার সালেকুজ্জামান সাগর।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ১৬টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার সমন্বয়ে গঠিত এ উপজেলায় সাড়ে চার লক্ষাধিক লোকের বাস। বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রন করতে পুলিশকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। কাজেই এখানে বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে। পুলিশ এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা নিয়ন্ত্রনে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল ইসলাম জানান, সার্বিক ভাবে আমাদের সামাজিক নানান ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে অবক্ষয় ঘটেছে। তুচ্ছ কারণে ঝিকরা এলাকায় দুটি হত্যাকান্ড তার প্রমান। এসব থেকে উত্তোরণের জন্য আমাদের আরো ভূমিকা নিতে হবে। জেলা প্রশাসনকে বিষয়গুলো অবগত করা হয়েছে। দ্রুত আমরা এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা নিয়ন্ত্রনে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।