, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাদক মামলায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাহাঙ্গীর আলম অবশেষে আদালতের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রায় সাত বছর ধরে পলাতক থাকার পর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন চাইতে গেলে তাঁর আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার ৯ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আবু শামীম আজাদ এ আদেশ দেন। আদালতের দায়রা সহকারী আব্দুল মজিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১) ধারার ৯(খ) উপধারায় জাহাঙ্গীর আলম সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলাটি পরে সেশন মামলা নম্বর ১৭১৩/২০১৫ হিসেবে বিচারাধীন ছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর বিচারক আনিসুর রহমান রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে জাহাঙ্গীর আলম সহ তিন আসামিকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপর দুই আসামিকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। জাহাঙ্গীর আলম গোদাগাড়ী পৌর এলাকার মাদারপুর গ্রামের নওশাদ আলীর ছেলে।
মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রকাশ্যে উপস্থিতি: পলাতক থাকার মধ্যেই সম্প্রতি গোদাগাড়ী থানার উদ্যোগে আয়োজিত একটি মাদকবিরোধী সমাবেশে জাহাঙ্গীর আলমকে প্রকাশ্যে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়।
ওই সমাবেশে তৎকালীন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান, রাজশাহীর পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির প্রকাশ্য উপস্থিতির বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে।
পরে তৎকালীন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় মাদক মামলায় তাঁর ১০ বছরের সাজার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসে।
এরই ধারাবাহিকতায় গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে পুলিশ তাঁর মাদারপুরের বাড়িতে অভিযান চালায়। তবে পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে আগেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান জাহাঙ্গীর।
একাধিক মামলায় আসামি: স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। গোদাগাড়ী থানায় ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মাদক মামলা এবং একটি অস্ত্র মামলা করা হয়। এর বাইরে ২০১৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় এবং ২০২০ সালে যশোরের কোতোয়ালি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক মাদক মামলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় পুলিশের তালিকায় জাহাঙ্গীর আলমকে পেশাদার মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
পরিবার ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা: জাহাঙ্গীর আলমের বাবা নওশাদ আলী, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘নওশাদ জামাতি’ নামে পরিচিত, তাঁকে নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নওশাদ আলী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তিনি গোদাগাড়ী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং বর্তমানে ওই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাদের ছত্রছায়ায় এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাহাঙ্গীর আলমকে এলাকায় প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে দেখা যায় বলে স্থানীয়রা জানান। বর্তমানে তিনি ও তাঁর বাবা আসন্ন গোদাগাড়ী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে প্রচার চালাচ্ছেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি।
বিপুল সম্পদের অভিযোগ: জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গোদাগাড়ীর মাদারপুর এলাকায় প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি।
এ ছাড়া মাদক ব্যবসার অর্থ বৈধ খাতে বিনিয়োগের আড়াল হিসেবে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে বড় আকারের গরু ও মহিষের খামার গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। এসব সম্পদের অর্থের উৎস ও মালিকানা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মাদক পাচার ও অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ গড়ে ওঠার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের অগ্রগতি বা কোনো সম্পদ জব্দের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিন সাজা পরোয়ানা নিয়ে পলাতক থাকার পর শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন আবেদন করতে গিয়ে কারাগারে যেতে হলো জাহাঙ্গীর আলমকে। জামিন আবেদন নামঞ্জুরের পর তাঁকে কাস্টডি মূলে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।