সর্বশেষ সংবাদ :

কালাইয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের রাস্তা ও খাস জমি দখলের অভিযোগ

কালাই প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তেলিহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা, পুকুরপাড় ও অন্যান্য সরকারি খাস সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনে প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি খাস খতিয়ানের জমিকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে সেখানে ইটের স্থাপনা নির্মাণ, চলাচলের রাস্তা সংকুচিত করা, পুরোনো গাছ কেটে নেওয়া এবং কবরস্থান ও পুরোনো উপাসনাস্থলের জায়গা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পৃথক লিখিত আবেদন করে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
উক্ত অভিযোগে তেলিহার গ্রামের আশরাফ ফকির, সিরাজুল ইসলাম ফকির ও ওসমান মোল্লার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সিরাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট জমি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি এবং এর পক্ষে তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে।
সরকারি নথিতে খাস সম্পত্তির উল্লেখ আশ্রয়ণ প্রকল্পের পক্ষ থেকে ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দেওয়া পৃথক আবেদনে সংশ্লিষ্ট জমিকে সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনে সংশ্লিষ্ট দাগ ও খতিয়ানের তথ্য তুলে ধরে ওই জমির অংশবিশেষ পুকুরপাড়, উপাসনাস্থল ও জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে যাতায়াতের পথেও বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা, স্থানীয় দরিদ্র মানুষ ও চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা দুর্ভোগে পড়ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবেদনে সংশ্লিষ্ট জমির বিবরণে সিএস খতিয়ান নং ৪৭, এমআর খতিয়ান নং ১ এবং সংশ্লিষ্ট দাগ নম্বরের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে পুকুরপাড় ও উপাসনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত জমির পরিমাণও উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলিহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি ফজলুর রহমান মোল্লা বলেন, প্রায় ৪০টি ভূমিহীন পরিবার এখানে বসবাস করছে। ২০০০ সাল থেকে তাঁরা এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখলের কারণে বর্তমানে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, একদিন হঠাৎ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব জায়গা নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে দখল শুরু করেন। আশ্রয়ণবাসীর প্রশস্ত রাস্তার ওপর ইটের স্থাপনা নির্মাণ করায় এখন রাস্তা বড়জোর সাড়ে চার ফুটের মতো রয়েছে। ফলে মানুষ চলাচল, পুকুরে মাছের খাবার নেওয়া কিংবা মাছ পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে।
আশ্রয়ণের বাসিন্দা বন্যা বলেন, রাস্তা সংকুচিত হওয়ায় ছোট-বড় যানবাহন ঢুকতে চায় না। এতে পুকুরের মাছ ও কৃষিপণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ও ক্লিনিকে রোগী যাতায়াতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
মুঞ্জুয়ারা নামে আরেক বাসিন্দার অভিযোগ করে বলেন, রাস্তার ওপর স্থাপনা নির্মাণের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের নারীরা বাধা দিয়েছিলেন। তখন আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এমনকি একজন কোদাল দিয়ে তাঁকে আঘাত করার চেষ্টা করেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা সহিদা বেগম বলেন, তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কবর ওই স্থানে রয়েছে। তাঁরা কবরগুলো ঘিরে গাছ লাগিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে কবরের চিহ্ন নষ্ট করে দেওয়া যাচ্ছে। আমার ভাসুর, ভাসুরের স্ত্রী এবং আমাদের দুই সন্তানের কবর এখানে রয়েছে। আমরা মারা গেলে কবর দেওয়ার জায়গা কোথায় হবে এটাই আমাদের চিন্তা।
তেলিহার গ্রামের ৮৫-৮৬ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন বলেন, আমার স্মরণশক্তি হওয়ার পর থেকেই ওই জমিকে খাস জমি হিসেবে দেখে আসছেন। সেখানে কবরস্থান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনার স্থানও ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা লালচান রবিদাসের দাবি, ওই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পুরোনো উপাসনাস্থল রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ সেখানে মানত ও পূজা করতে আসেন। বর্ষাকালে পূজা ও ভোগের সুবিধার জন্য স্থানীয়রা সেখানে টিনের ছাউনি তৈরি করেছিলেন। পরে ওই স্থাপনা ভেঙে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সরেজমিনে ওই এলাকায় একটি পুরোনো গাছের নিচে ধর্মীয় উপকরণ ও একটি শিবলিঙ্গসদৃশ স্থাপনা, করব স্থান, একটি ক্লিনিক, ৪০টি ভূমিহীনদের আশ্রয় ঘর, ১০ বিঘার একটি পুকুর দেখা যায়।
আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেখানে কোনো মন্দির নেই। একটি পুরোনো গাছ আছে, যেখানে হিন্দু-মসলমান মানত করে। কবরস্থানের কথা বলা হলেও সেখানে কয়েকটি কবর আছে, সেগুলো আমাদের স্বজনদের। অন্য কোনো গ্রামবাসীর কবর নেই।’
তিনি আরও দাবি করেন, যে পুরোনো গাছগুলো কাটা হয়েছে, সেগুলো তাঁদের নিজেদের। সরকারি কোনো গাছ কাটা হয়নি। জমির মালিকানার পক্ষে তাঁদের কাগজপত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অনুরূপ মন্তব্য করেছেন অভিযুক্ত আশরাফ ফকির ও ওসমান মোল্লা।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জমির রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এরপর যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি রেকর্ডে জমির প্রকৃত মালিকানা ও শ্রেণি যাচাই করে দখল হয়ে থাকলে তা দ্রুত উদ্ধার করা হোক। তাদের আরও দাবি, দীর্ঘ দিন আগে থেকে যে যায়গা দিয়ে জনগণ চলাচল করেছে, নিজের জায়গা হলেও জোর পূর্বক সংকুচিত করা সেই রাস্তা প্রশাসনকে আগের মতো প্রশস্ত করে চলাচলের উপযোগী করে দিতে হবে। একই সঙ্গে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা, কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার পথ এবং জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থানগুলো দখলমুক্ত করার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।


প্রকাশিত: August 28, 2026 | সময়: 4:04 am | সুমন শেখ