সর্বশেষ সংবাদ :

রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ প্রশাসনের: ঘোড়ার মাংস বিক্রির অভিযোগ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’, দাবি ফাইসালের

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা বাজারের গরুর কালাভুনা ও ভাজা মাংসের বেশ সুনাম রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোজনরসিকেরা এখানে আসেন মাংসের স্বাদ নিতে। সেই নওহাটার ফাইসালের হোটেলের বিরুদ্ধে গরুর মাংসের নামে ঘোড়ার মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এ অভিযোগের সূত্রপাত।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ফাইসাল পবা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তবে অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি করে তিনি বলেছেন, তাঁর ব্যবসার সুনাম নষ্ট করতেই এমন অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
অভিযোগের পর মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা হোটেলটি পরিদর্শন করে কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মাংসে অন্য কোনো প্রাণীর মাংস মেশানো হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর আগে সোমবার (২৪ আগস্ট) ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ১৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে ফাইসালের হোটেলে মানুষের ভিড় এবং কর্মীদের মাংস রান্নার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া লেখায় দাবি করা হয়, হোটেলটিতে গরুর মাংসের সঙ্গে ঘোড়ার মাংস মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি জামালপুর থেকে গভীর রাতে ঘোড়ার মাংস এনে গরুর মাংসের সঙ্গে মেশানোর অভিযোগও করা হয়।
হোটেল পরিদর্শনে গিয়ে পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাইসালের কালাভুনায় গরুর মাংসের সঙ্গে ঘোড়ার মাংস মিশিয়ে বিক্রির অভিযোগ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁরা বিষয়টি তদন্তে নেমেছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে হোটেলটি পরিদর্শন করা হয়েছে। সেখান থেকে কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন সোহরাব খান বলেন, নমুনাগুলো ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে। পরীক্ষার মাধ্যমে মাংসটি গরুর কি না, কিংবা এর সঙ্গে অন্য কোনো প্রাণীর মাংস মেশানো হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব। পরীক্ষার ফল পেতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। বিশেষ ক্ষেত্রে এক সপ্তাহও লাগতে পারে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বলেন, শুধু ফাইসালের হোটেল নয়, নওহাটা এলাকার অন্যান্য মাংস বিক্রেতা ও কসাইদের বিষয়েও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। মাংস কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং কারা সরবরাহ করেন, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী নিয়মিত তদারকি করা হবে।
প্রায় অর্ধশত বছর আগে ফাইসালের দাদা বছির আলী নওহাটা ব্রিজের পাশে ছোট একটি দোকান দিয়ে রুটি ও সবজির ঘাঁটি বিক্রি শুরু করেন। চার আনায় এক পোয়া রুটি দেওয়া হতো, সঙ্গে থাকত ঘাঁটি। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে জাফর আলী ব্যবসার দায়িত্ব নেন। এরশাদ সরকারের আমলে দোকানটি রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের পাশ থেকে নওহাটা হাটে স্থানান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে এ অঞ্চলে রুটির বদলে ভাতের প্রচলন বাড়তে থাকায় দোকানেও পরিবর্তন আসে। একসময় রুটি বিক্রি বন্ধ হয়ে শুরু হয় ভাতের সঙ্গে গরু, খাসি, মুরগি ও হাঁসের মাংস বিক্রি। তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় গরুর ভাজা মাংস। জাফর আলীই নওহাটায় প্রথম এই মাংস বিক্রি শুরু করেন। ২০১০ সালের দিকে বাবার সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হন ফাইসাল।
বর্তমানে ফাইসালের হোটেলে প্রতিদিন ভাতের সঙ্গে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি রান্না করা মাংস বিক্রি হয়। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে এক হাজার মানুষ খাবার খান। বৃষ্টির দিনে বিক্রি কিছুটা কমলেও অন্য সময় ক্রেতার চাপ থাকে। নওহাটায় এখন বেশ কয়েকটি কালাভুনার হোটেল গড়ে উঠলেও ফাইসালের হোটেলটি এখনও সবচেয়ে পরিচিতগুলোর একটি।
অভিযোগের বিষয়ে ফাইসাল বলেন, ‘আমাদের এই হাটে ঘোড়ার মাংস তো দূরের কথা, জীবিত ঘোড়াই নেই। সেখানে ঘোড়ার মাংস বিক্রি করার প্রশ্নই ওঠে না। ফেসবুকে একজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পোস্ট দিয়েছেন। এতে আমাদের মন খুব খারাপ হয়েছে। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আমি কখনও ঘোড়ার মাংস মিশিয়ে বিক্রি করেছি, তাহলে তাঁকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। একই সঙ্গে হোটেলও চিরতরে বন্ধ করে দেব।’ ফাইসালের বাবা জাফর আলী বলেন, ‘এটা আমার বাবার হাতের ব্যবসা। আমরা এক পয়সাও হারাম খাব না। আমরাও তদন্ত চাই। তদন্ত হলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। এখানে ৬৪ জেলা থেকে মানুষ খেতে আসে। সুনাম আছে বলেই তারা আসে। এই সুনাম নষ্ট করতেই গুজব ছড়ানো হয়েছে।’
পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে গুজব ছড়িয়ে দোকানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে ফাইসাল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হবে। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আদালতে মানহানির মামলা করতে পারেন বলেও তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


প্রকাশিত: August 26, 2026 | সময়: 5:10 am | সুমন শেখ