, , ।
মোকাররম হোসেন, কালাই: চলতি বছরের মৌসুমের শুরুতে কম দাম পাওয়ায় পরে দাম বাড়ার আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন জয়পুরহাটের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু চার মাস পেরিয়ে গেলেও বাজারে সেই প্রত্যাশিত দাম ফেরেনি। বরং চাহিদা কম থাকায় আলুর দাম আরও নেমেছে। এতে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় তুলতে না পেরে প্রতি ৬০ কেজির বস্তায় ৪৪০ থেকে ৪৮০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। গড় হিসাবে এই লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪৬০ টাকা।
একই সঙ্গে হিমাগার থেকে আলু খালাসের গতিও এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ খালাস হয়েছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ আলু এখনও হিমাগারে রয়েছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে প্রায় ৪৫ শতাংশ আলু খালাস হয়েছিল, এবার সেখানে খালাস হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। ফলে গতবছরের তুলনায় এবার হিমাগারে অনেক বেশি আলু আটকে রয়েছে।
হিমাগার গেটে বর্তমানে ৬০ কেজির এক বস্তা সাদা ডায়মন্ড সহ বিভিন্ন জাতের আলু ৯২০ থেকে ৯৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন, পরিবহন, বাছাই ও হিমাগার ভাড়া সহ প্রতিবস্তা আলুর পেছনে কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা। ফলে সর্বনিম্ন ৯২০ টাকা দরে বিক্রি করলে লোকসান হচ্ছে ৪৮০ টাকা এবং ৯৬০ টাকা দরে বিক্রি করলে লোকসান ৪৪০ টাকা। মাঝামাঝি ৯৪০ টাকা দরে বিক্রি ধরলে গড়ে বস্তাপ্রতি লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৪৬০ টাকা।
কালাই উপজেলার পুর গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ৮০০ বস্তা আলু হিমাগারে রাখতে ভাড়া সহ তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। চার মাস পর সেই আলু বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এতে তাঁর প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম কম থাকায় পরে ভালো দাম পাওয়ার আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস পরও দাম না বাড়ায় এখন মূলধন হারিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কালাই উপজেলার মাদারপুর গ্রামের লোকমান হোসেন, বাদাউচ্চ গ্রামের মাজহারুল ইসলাম, মাদাই গ্রামের বেলাল হোসেন সহ কয়েকজন আলুচাষি জানান, বাজার নিম্নমুখী হওয়ায় তাঁরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। হিমাগারে সংরক্ষিত প্রতি ৬০ কেজি বস্তা আলুতে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বাদ দিয়ে বর্তমানে গড়ে প্রায় ৪৬০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাঁরা আলুর বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে রপ্তানি বাড়ানোর দাবি জানান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার টন। গত বছরের তুলনায় আলুর আবাদ প্রায় ৫ হাজার হেক্টর কমলেও উৎপাদনের পরিমাণ স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বেশি। জেলার ২২টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার ৯৮২ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এদিকে আমন ধানের মৌসুম শুরু হওয়ায় কৃষকদের এখন জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার ও শ্রমিকের মজুরি সহ বিভিন্ন খরচের জন্য অর্থ প্রয়োজন। সাধারণত এ সময় হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করে এসব খরচ মেটান তাঁরা। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় অনেক কৃষক আলু খালাস করেও বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে একদিকে হিমাগারে তাঁদের মূলধন আটকে আছে, অন্যদিকে আমন চাষের খরচ জোগাড়েও সংকট দেখা দিয়েছে।
আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। কালাই উপজেলার পুনট হাটের আলু ব্যবসায়ী মিঠু ফকির ও সাইদুর রহমান জানান, কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনে বিভিন্ন জেলার মোকামে পাঠিয়েও এখন লাভ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি ট্রাকে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী আলু কেনাবেচা কমিয়ে দিয়েছেন।
কালাই উপজেলার বৈরাগীহাটের আলু ব্যবসায়ী মাহবুব বলেন, সংরক্ষণ মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী হিমাগার মালিকদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আলু কিনে মজুত করেছিলেন। এখন বাজার পড়ে যাওয়ায় আলু বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদেরও বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে পড়তে হয়েছে।
কালাই উপজেলার আলু রপ্তানিকারক ‘সূচি এন্টারপ্রাইজের’ স্বত্বাধিকারী সুজাউল ইসলাম বলেন, তাঁরা দীর্ঘ নয় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করছেন। তবে এবার বিদেশি বাজারে চাহিদা কম থাকায় রপ্তানির পরিমাণও প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। দেশে উৎপাদিত অতিরিক্ত আলু রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
হিমাগার মালিকরাও এবার আলু খালাসের ধীরগতিতে উদ্বিগ্ন। কালাইয়ের পুনট কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার ঘোষ জানান, তাঁদের হিমাগারে আড়াই লাখের বেশি বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে। বাজারে দাম কম থাকায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
কালাই পৌর এলাকার সরাইলে এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন ও সালামিন কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক আইয়ুব আলী জানান, তাঁদের হিমাগারে গত মার্চে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এরমধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু এখনও হিমাগারে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব আলু খালাস করা না গেলে হিমাগার ব্যবস্থাপনায়ও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কৃষকদের দাবি, অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে এবার বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় দ্রুত রপ্তানি বাড়ানো, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আলুর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক যাতে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় যৌক্তিক দাম পান, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমেছে। বাজার সচল করা এবং কৃষক যাতে যৌক্তিক দাম পান, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।