, , ।
নুরুজ্জামান, বাঘা: আষাঢ়ের টানা বৃষ্টিতে রাজশাহীর বাঘা যেন ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ। কাদামাখা পথ, জলাবদ্ধতা আর মাথার ওপর ছাতা সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক বাঘার হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মানুষের কর্মব্যস্ততার অনন্য মেলবন্ধনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে প্রায় পাঁচ শতকের ঐতিহ্যবাহী এই হাট।
সীমান্তবর্তী ও পদ্মা নদীবিধৌত বাঘার হাট উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র। স্থানীয়দের মতে, ১৫২৩ সালে সুলতান নসরত শাহ বাঘা শাহী মসজিদ নির্মাণের পর এ এলাকায় জনবসতি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে বাঘার ঐতিহাসিক এই হাট, যা আজও এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার বসা এই হাটে ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সমাগম ঘটে। প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত বাজারে কৃষিপণ্য, গৃহস্থালির সামগ্রী, পোশাক, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক পণ্য, মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে পুরোনো যানবাহনেরও কেনাবেচা হয়। বিশেষ করে পদ্মার চরাঞ্চলের উর্বর জমিতে উৎপাদিত বেগুন, পটল, আলু, কচু, লাউ, কুমড়া, মরিচ, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, রসুন ও কলার জন্য বাঘার হাটের সুপরিচিতি রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এখানকার বিপুল পরিমাণ সবজি ট্রাকযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। আমের মৌসুমে এই হাট উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ আমের বাজারে পরিণত হয়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উন্নতমানের কৃষিপণ্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা নিয়মিত এখানে আসেন। শুধু বাঘার চরাঞ্চল নয়, পুঠিয়া, চারঘাট, লালপুর, ঈশ্বরদী, দৌলতপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য নিয়ে এই হাটে আসেন।
বাঘার সমাজসেবক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান খন্দকার মনোয়ারুল ইসলাম মামুন বলেন, “একসময় বড় বড় নৌকায় করে ব্যবসায়ীরা এই হাটে আসতেন। নদীপথের গুরুত্ব কমলেও বাঘার হাটের বাণিজ্যিক গুরুত্ব আজও অটুট। হাজারো মানুষের জীবিকা এই হাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।” ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঘা পৌরসভার অর্থনৈতিক বিকাশেও এই হাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে বর্ষাকালে কাদা, জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দুর্ভোগ বাড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজস্ব আদায়ের তুলনায় হাটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনও পর্যাপ্ত নয়। এলাকাবাসীর দাবি, ঐতিহাসিক বাঘা শাহী মসজিদ, হযরত শাহদৌলার মাজার, সু-বিশাল দিঘী, জাদুঘর, পদ্মা নদী এবং পাঁচ শতকের ঐতিহ্যবাহী বাঘার হাটকে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা হলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আরও বিকশিত হতে পারে। পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, “ঋতু বদলায়, নদীর গতিপথ বদলায়, কিন্তু বর্ষার বৃষ্টিতে ভেজা বাঘার হাট আজও এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে এই হাট টিকে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।” তিনি হাটের অবকাঠামোগত উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।