সর্বশেষ সংবাদ :

কালাইয়ে খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ ফেরত গেল ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা

কালাই প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের কালাইয়ে সেই তালোড়া-বাইগুনি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে এবার শ্রমিক তালিকায় ব্যাপক গড়মিল ওঠে আসছে। সেই সাথে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। এলাকার অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় খাল পুনঃখনন কাজে প্রায় ৫২ লাখ টাকার প্রকল্পে কাগজে-কলমে ১২৫ জন শ্রমিকের নাম থাকলেও বাস্তবে মাঠে কাজ করেছেন ৬০ থেকে ৬৫ জন। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত শ্রমিকদের পরিবর্তে প্রকল্প সভাপতি ও বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেনের আপন ছোট ভাই, ভাগিনা-ভাতিজা ও নিকট আত্মীয়-স্বজন সহ স্বচ্ছল পরিবারের ব্যক্তিদের নাম শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শ্রমনির্ভর কর্মসূচির নীতিমালা উপেক্ষা করে অধিকাংশ খননকাজ এক্সকাভেটর (ভেকু মেশিন) দিয়ে করা হলেও শ্রমিকদের নামে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলণ করে আত্মসাৎ করার অভিযোগও ওঠেছে। এমনকি অন্য এলাকার ব্যাক্তিদের নামও শ্রমিক তালিকায় দেখানো হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার খাল পুনঃখননের জন্য ৫২ লাখ টাকার বরাদ্দ হয়। চলতি বছরের মে মাসে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হয়। ১২৫ জন শ্রমিকের তালিকাও দেন প্রকল্প সভাপতি। কিন্তু সরেজমিনে দেখা উল্টো চিত্র। খালের অধিকাংশ স্থানেই ভেকু মেশিন দিয়ে খনন করা হয়েছে। খালের পাড়ে হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিককে কোদাল দিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে। প্রকল্প চলাকালিন সময়ের মধ্যে কোনো দিনই ৬০ থেকে ৬৫ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেননি বলে দাবি স্থানীয়দের।
দাখিলকৃত শ্রমিক তালিকায় দেখা যায়, ক্রমিক নম্বর ৩. তুহিন মাহমুদ, ৮. আবুল হোসেন, ১৮. সাজ্জাদুল ইসলাম, ২১. আনোয়ার হোসেন, ৪৩. রমজান আলী প্রামাণিক, ৪৫. রেজাউল হক, ৫৭. এনামুল হক সরকার, ৬১. রুবেল হোসেন, ৬৬. মফিদুল ইসলাম, ৬৭. মামুনুর রশিদ প্রামাণিক, ৭৮. তারেকুল ইসলাম, ৮২. তৌফিকুল ইসলাম, ৯৬ এনামুল হক প্রামাণিক, ৯৭. মাহমুদুল হাসান এবং ১১৬. আবু জাহের ফকির পেশাদার দিনমজুর নন। অথচ তাদের নাম শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়াও ওই তালিকায় প্রকল্প সভাপতি আমজাদ হোসেনের আপন ছোট ভাই ৩৯ ও ৫৫ নম্বরে থাকা আলমগীর ও হোসেন আমিনুল ইসলাম। ২৪ নম্বর জিয়াউর রহমান ও ৩৪ নম্বর সুজাউল ইসলাম তাঁর আপন চাচাতো ভাই। ৬৮ নম্বর সানাউল হক মন্ডলল তাঁর মামা এবং ৯৫ নম্বর এসআই পাশা তাঁর আপন ভাতিজা। একই তালিকার ৪২ নম্বর এম এ ফারুক হোসেন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার শ্যালক বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শ্রমিক তালিকার ৬১ নম্বর রুবেল হোসেনের ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে প্রকল্প সভাপতির ছোট ভাই আরিফুল ইসলামের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে ৬০ নম্বর হাফেজ আকন্দের চেকে আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষর করে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন। ওই হিসাবের সঙ্গে প্রকল্প সভাপতির মেয়ে আমিনা খাতুন তিশার মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিক তালিকার কয়েকজন ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, তাঁদেরকে কখনই ওই প্রকল্পে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। শ্রমিক তালিকায় নাম আছে বলেই প্রভাব খাটিয়ে তাদের কাছ থেকে আগেই চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। পরে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পর কারও হাতে ৫’শ ওথকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কোনো টাকাই পাননি। অথচ শ্রমিকদের ব্যাংক একাউন্ট থেকে দুই কিস্তিতে প্রায় ১০ হাজার করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও তালোড়া-বাইগুনি গ্রামের বাসিন্দা সুমির জালাল বলেন, শ্রমিক তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম করেছে প্রকল্প সভাপতি। আমজাদ হোসেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পায়না। কাজের অনিয়মতো রয়েছেই, তালিকা খতিয়ে দেখলে ৭০ জন শ্রমিকের বেশী পাওয়া যাবেনা। বাদবাকি সবাই প্রকল্প সভাপতির নিকট আত্মীয়-স্বজন।
প্রকল্প সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, এখন প্রকল্পের কাজ করবো না তো কি চুরি করে খাব, শ্রমিকের তালিকায় আমার ভাই, ভাতিজা ও স্বজনদের নাম আছে তো কি হয়েছে ? কি লিখার আছে লিখেন তো?
জমা দেওয়া তালিকার ১২৫ জন শ্রমিক নিময়মিত কাজ করেছে কি না সে বিষয়ে ভিডিও চিত্র দেখতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাসিবুল ইসলাম ওই বিষয়ে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, শ্রমিক তালিকায় প্রকল্প সভাপতির কয়েকজন নিকট আত্মীয় ও আওয়ামী লীগ নেতার আত্মীয়ের নাম থাকার বিষয়টি নজরে এসেছে। ইতমধ্যে ওই প্রকল্পের বরাদ্দকৃত ৫২ লাখ মধ্যে নিদ্ধারিত সময়ে কাজ সমাপ্ত না হওয়ায় ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, শ্রমিকের তালিকায় অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। কাজ সমাপ্ত না হওয়ায় বিল পরিশোধ করা হয়নি। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রকল্প সভাপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


প্রকাশিত: July 16, 2026 | সময়: 4:55 am | সুমন শেখ