, , ।
সানশাইন ডেস্ক: বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী রিয়াদ মাহমুদের কথায়।
তিনি বলছেন, নির্বাচনের আগে বিনিয়োগকারীরা দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় ছিলেন। কিন্তু নতুন বিনিয়োগের জন্য যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার, নির্বাচনের পরও বিশ্ব বাস্তবতার কারণে তারা তা পাচ্ছেন না। রিয়াদ মাহমুদ প্রশ্ন তুলেছেন দেশের ব্যাংকের সক্ষমতা নিয়েও। তার পর্যবেক্ষণ হল, অধিকাংশ ব্যাংকই ‘সক্ষমতা হারিয়েছে’।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’ এ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ। নিজের কোম্পানির অবস্থা এবং আসন্ন বাজেট নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তবে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ ও আস্থার সংকটের কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কাছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন প্রায় ৫৮ শতাংশ হ্রাস পায়।
ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) গত এপ্রিলে প্রকাশিত ‘ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বিদেশি মুদ্রার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি আমদানিতে বিলম্ব, সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অনিশ্চয়তা মিলে দীর্ঘদিন ধরে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এই অস্থিরতা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বিদেশিদের আস্থাকে দুর্বল করছে। তারা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আরও সতর্কভাবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা আশায় ছিলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক সরকার এলে হয়ত বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হবে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এরেও পরিস্থিতির খুব বেশি হেরফের হয়নি।
রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “এটা অনেকগুলো ভ্যারিয়েবলের ওপরে নির্ভর করে। আমরা যদি ফেব্রুয়ারি মাসের আগের কথা চিন্তা করি, সেটা দেশি বিনিয়োগকারী হোক কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারী, তারা স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় ছিলেন, স্থিতিশীল রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় ছিলেন, যাদের প্রেডিক্ট করা যায়। “ফেব্রুয়ারির ইলেকশন যখন হল, মার্চে শুরু হল, তখন উই অল স্টার্টেড উইথ আ ভেরি অপটিমিস্টিক ভিউ। আমরা অনেক ইনভেস্টমেন্টের কথা চিন্তা করেছি, ব্যবসা বাড়ানোর কথা চিন্তা করেছি।” কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাশিত সেই ইতিবাচক পরিবর্তন যে ঘটেনি, সে কথা তুলে ধরে ন্যাশনাল পলিমারের এমডি বলেন, “আমি ঠিক সরকারকেও দোষ দিতে পারি না। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি সাপ্লাই কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের একটা সমস্যা সৃষ্টি হল। ডিজেলের দামও বেড়ে গেল।
“এতে করে ম্যানুফ্যাকচারিং কস্ট বেড়ে যাচ্ছে, পণ্য পরিবহনের কস্ট বেড়ে যাচ্ছে। তো সবকিছু মিলিয়ে আমরা কিন্তু একটা অস্থিরতার মধ্যে আছি।” রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “যখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে, তখনেই আমরা নতুন কিছুতে বিনিয়োগের কথা ভাবি। সেই স্থিতিশীলতা এখন নেই। আর সে কারণেই নতুন করে বিনিয়োগের কথা কোনো উদ্যোক্তা এখন চিন্তা করছেন না।”
বিনিয়োগ না বাড়ার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ব্যংক ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলছেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “অনেক ব্যাংকই কিন্তু তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে, নানা কারণে এবং ভুল নীতির কারণে। তো সেখান থেকে যদি প্রপার রিকভারি না আসে, ইকুইটি দিয়ে নতুন ইনভেস্টমেন্ট করা—ইট উইল বি ডিফিকাল্ট। ইনভেস্ট করব, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল পাব কোথা থেকে?”
ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের পরিস্থিতি নিয়ে রিয়াদ মাহমুদের ভাষ্য, “আমরা ব্যবসায়ী কমিউনিটি তথা উদ্যোক্তা, বিশেষ করে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সবসময় আশাবাদী এবং ইতিবাচক। “ন্যাশনাল পলিমার সম্পর্কে আমি এখন যেটা বলতে চাই, এই পরিস্থিতিতে কোনো ব্যবসা যদি সারভাইভ করে, তবে সে খুবই ভালো করছে। সে ক্ষেত্রে আমরা বলব, আমরা সারভাইভ করছি।”
কয়েক দশক ধরে দেশের বাজারে একটি পরিচিত নাম ন্যাশনাল পলিমার। দীর্ঘ সময় এই অবস্থান ধরে রাখার পেছনের গল্প সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন রিয়াদ মাহমুদ। তার ভাষ্য, এই সাফল্যের পেছনে আছে কেবল একটি শব্দ, তা হল—‘কোয়ালিটি, কোয়ালিটি, কোয়ালিটি’। “আমরা যখন প্রথম শুরু করি, আমরা কোয়ালিটি ধরে রেখেছি। তখন আমাদের ক্রেতা ছিল কম। সে সময় বাজার লোকাল ছোট ছোট মেশিননির্ভর, অলিগলি-বাজারকেন্দ্রিক কোম্পানিগুলোর দখলে ছিল, যাদের কোনো কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড ছিল না। তারা না বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করত, না ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড, না আইএস স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু আমরা করতাম।”
জ্বালানি ও গ্যাসের চলমান সংকট নিয়ে প্রশ্ন করলে রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “দিস ইজ আ গ্রেট বিগ প্রবলেম।” তিনি বলেন, “আজ আমাদের ক্যাপটিভ পাওয়ার আছে বলেই আমাদের ফ্যাক্টরিগুলোতে উৎপাদন সচল আছে। কিন্তু আমি যদি বিদ্যুতের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতাম, সেটাও দিনের বেলায় কয়েকবার যায়। এতে করে যারা আমরা কন্টিনিউয়াস প্রোডাকশনের উপর নির্ভরশীল, তাদের স্ট্রেস বেড়ে যেত। আমাদের বাড়ছে না, সেটা অন্য বিষয়। ওভারঅল ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর অবশ্যই সাফার করছে।”
সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেও ব্যবসায় প্রভাব পড়ার কথা বলছেন ন্যাশনাল পলিমারের এমডি। আসন্ন বাজেট নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট’ এখন চাপের মধ্যে আছে। সে কারণে কাঁচামালের ওপরে শুল্ক না বাড়ানোই ব্যবসার জন্য ভালো।
“আমি কমানোর কথা বলছি না, কারণ আমরাও জানি সরকারের রাজস্ব প্রয়োজন। (কিন্তু শুল্ক বাড়ালে) আমাদের প্রোডাক্টের প্রাইস বাড়বে, তাহলে আমাদের ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কিছুটা বাইরে চলে যাবে, সেলস পড়বে, আমাদের ক্যাপাসিটি আইডল থাকবে।” বন্ধ কলকারখানা চালুসহ অর্থনীতি চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের যে ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে, তাকে স্বাগত জানান রিয়াদ মাহমুদ।
তবে তিনি এও বলেন,“আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই—উই ডোন্ট নিড চ্যারিটি। আমাদের সক্ষমতা আছে, কিন্তু এই সময়ে যার ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সাপোর্টের অভাবে তারা প্রপার ইউটিলাইজেশন অব ক্যাপাসিটি করতে পারছে না, এই ফান্ড থেকে যাতে করে তাদের সহায়তা দেওয়া হয়।
“তা না হলে, সেই দিন কিন্তু বেশি দূরে নয়—দেখব যে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে সচল কোম্পানি আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাবে। তো যদি বাজেটের বিষয় হয়, অবশ্যই এগুলো কনসিডার করা উচিত।” রিয়াদ মাহমুদ জর্জিয়ার অনারারি কনসাল। বাংলাদেশ ও জর্জিয়ার ট্রেড রিলেশন নিয়ে তার ভাষ্য, “বাংলাদেশের সাথে জর্জিয়ার ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশন খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে তুরস্ক হয়ে জর্জিয়ায় রপ্তানি হয়। “আমাদের আরেকটি উদীয়মান শিল্প আছে—ফুটওয়্যার। আমরা চেষ্টা করছি জর্জিয়ায় সেটা পপুলার করার।”