সর্বশেষ সংবাদ :

‘হাম’ নিয়ে দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা

সবুজ ইসলাম: রাজশাহীতে হামের প্রকোপ বাড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে নগরী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। গত কয়েকদিন ধরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে অনেক মা-বাবা তাদের অসুস্থ শিশুকে নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জায়গা না থাকায় অনেকে হাসপাতালের মেঝেতে থেকে তাদের বাচ্চাদের চিকিৎসা নিচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা অভিভাবক আব্দুল কাদের বলেন, “গ্রামে প্রথমে বুঝতেই পারিনি এটা হাম। পরে অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। অনেক রোগীর চাপ থাকায় এখন বেড পেতেও কষ্ট হচ্ছে।”
নাটোর থেকে আসা তাবাচ্ছুম বলেন,“প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি যে এটা হাম। যখন বাচ্চার সমস্যা হচ্ছিল তখন হাসপাতালে নিয়ে এসে দেখি আমার বাচ্চার হাম হয়ে গেছে। বাচ্চার বয়স মাত্র ৪ মাস। হামের টিকা নেওয়ার সময়ও হয়নি। এখন হাসপাতালে আছি, দেখি ডাক্তাররা কি করে।”
রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া খাতুন বলেন, “আমার বাচ্চার বয়স মাত্র ৫ মাস। হঠাৎ জ্বর আর গায়ে লাল দানা উঠল। ডাক্তার বললেন হাম হতে পারে। এখন সবসময় ভয় লাগছে, যদি কিছু হয়ে যায়!”
তবে আক্রান্ত বাচ্চাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গ্রাম থেকে শহর সবখানেই এখন হাম নিয়ে আতঙ্ক। শুধু শহর নয়, আশপাশের উপজেলা ও গ্রামগুলোতেও একই চিত্র। অনেক অভিভাবক শুরুতে সাধারণ জ্বর বা ঠান্ডা ভেবে অবহেলা করলেও পরে হামের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে। নওগাঁর পত্নীতলা থেকে আসা গৃহিণী শিউলি বেগম বলেন, “প্রথমে ভাবছিলাম সাধারণ জ্বর। কিন্তু পরে শরীরে ফুসকুড়ি উঠলে ভয় পেয়ে যাই। এখন হাসপাতালে ভর্তি, কিন্তু মনটা খুব অস্থির।”
তবে চিকিংসকেরা জানিয়েছেন টিকা না নেওয়ায় বেশি ঝুঁকি রয়েছে আক্রান্ত শিশুদের। আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ এখনো টিকার আওতায় আসেনি। সাধারণত ৯ মাস বয়সের আগে হাম প্রতিরোধের টিকা দেওয়া হয় না, ফলে ছোট শিশুদের ঝুঁকি বেশি।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ৫২০টি নমুনা পরীক্ষা করা হলে এর মধ্যে ১৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার ৩০-৩৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া বিভাগের আটটি জেলায় প্রায় ৫০০ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত কয়েকদিনে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছুদিন আগেও যেখানে ভর্তি রোগী ছিল শতকের নিচে, কিন্তু বর্তমানে তা বেড়ে ১৩০ জনে পৌঁছেছে। বর্তমানে শুধু এই হাসপাতালেই হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫২ জনের বেশি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় (শুক্রবার) হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে এক শিশু।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন,“ হামে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা স্বাভাবিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, তাই অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে মোট ৩৪০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি হওয়া সব রোগীকে প্রাথমিকভাবে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এটি নিশ্চিতভাবে হাম কি না তা পরীক্ষা করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এবং বর্তমানে রাজশাহীতে এই পরীক্ষার সুবিধা নেই। আমরা চেষ্টা করছি”
তবে জনসাধারণের মতে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজশাহীর হাজারো পরিবার এখন এক অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন করে কেউ না কেউ আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা। হাম এখন শুধু একটি রোগ নয়, এটি যেন অভিভাবকদের জন্য এক বড় উদ্বেগের নাম হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই দুশ্চিন্তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


প্রকাশিত: April 4, 2026 | সময়: 4:46 am | সুমন শেখ